দুর্নীতির পাহাড় গড়েছেন সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ

আত্মগোপনে থাকা সাবেক মন্ত্রী ড. মোহাম্মদ হাছান মাহমুদ বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। স্ত্রী, কন্যা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে-বেনামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেখে বিস্মিত হয়েছেন দুদকের কর্মকর্তারা।

ব্যাংক লেনদেনে বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান

দুদকের অনুসন্ধানে ৭০টি ব্যাংক হিসাব পাওয়া গেছে, যেখানে সাড়ে ৭০০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে এই হিসাবগুলোতে ২৩ কোটি ৬০ লাখ ৭৪ হাজার ২০২ টাকা জমা রয়েছে।

যেসব ব্যাংকে লেনদেন হয়েছে:

  • গ্লোবাল ইসলামি ব্যাংক (১৬টি হিসাব)
  • মেঘনা ব্যাংক (১৭টি হিসাব)
  • এবি ব্যাংক (৯টি হিসাব)
  • মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (২টি হিসাব)
  • ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক (১৮টি হিসাব)
  • জনতা ব্যাংক (১টি হিসাব)
  • ইউনিয়ন ব্যাংক (৪টি হিসাব)
  • পুবালী ব্যাংক (১টি হিসাব)

পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততা

হাছান মাহমুদের দুই ভাই এরশাদ মাহমুদ ও খালেদ মাহমুদের নামেও বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাওয়া গেছে। তাদের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার, চট্টগ্রামে জমি দখল, বন বিভাগের পাহাড় দখল, আবুধাবির আজমানে রিসোর্ট নির্মাণ, ঢাকায় বহুতল ভবন ও ফ্ল্যাট ক্রয়সহ নানা অভিযোগ উঠেছে।

দুদকের অনুসন্ধান টিম

এই দুর্নীতির তদন্তে দুদকের পাঁচ সদস্যের টিম কাজ করছে। সদস্যরা হলেন:

  • মো. মোস্তাফিজুর রহমান (উপ-পরিচালক)
  • কমলেশ মন্ডল (উপ-পরিচালক)
  • আল আমিন (সহকারী পরিচালক)
  • মিনহাজ বিল ইসলাম (সহকারী পরিচালক)
  • খোরশেদ আলম (সহকারী পরিচালক)

অবৈধভাবে জাহাজ ব্যবসায় সম্পৃক্ততা

দুদক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মন্ত্রী থাকা অবস্থায় হাছান মাহমুদ তার স্ত্রী নুরান ফাতেমাকে জাহাজ ব্যবসার লাইসেন্স পেতে সহায়তা করেন। তার মালিকানাধীন বিসমিল্লাহ মেরিন সার্ভিসেস নামে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের এফএমসি গ্রুপের জাহাজ নির্মাণের চুক্তির টাকা পরিশোধ না করা এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে জাহাজ দখলের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া, রূপালী ব্যাংক থেকে ১২ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করায় সুদসহ সেই পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

মেয়ের নামে বিপুল অর্থ লেনদেন

হাছান মাহমুদের কন্যা নাফিসা জুমাইনা মাহমুদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে চারটি হিসাব পাওয়া গেছে, যেখানে লেনদেন হয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং বর্তমানে ৯৬ লাখ টাকা জমা রয়েছে।

গোপনে শত শত কোটি টাকার সম্পদ

দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাছান মাহমুদের রয়েছে:

  • চট্টগ্রামের দেওয়ানবাজারে তিনটি বহুতল ভবন
  • রাঙ্গুনিয়ায় বন বিভাগের ১৬.১৯ একর জমি দখল করে আবাসন প্রকল্প
  • সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে বাড়ি, হোটেল ও স্থাবর সম্পদ
  • রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্লট ও বাড়ি
  • কানাডায় বাড়ি
  • এফডিসির পাশে শতকোটি টাকা মূল্যের বাণিজ্যিক প্লট

ক্ষমতার অপব্যবহার ও মামলা

সরকার পতনের পর হাছান মাহমুদের স্ত্রী নুরান ফাতেমাসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। এতে চট্টগ্রামের এফএমসি গ্রুপের জাহাজ দখল, বলপ্রয়োগ ও হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সরকারি সম্পত্তি দখল ও বন বিভাগের জমি দখল

হাছান মাহমুদ মন্ত্রী থাকাকালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় বন বিভাগের ২১২ একর জমি দখল করে সেখানে বাগানবিলাস নির্মাণ ও গরুর খামার গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বন বিভাগ সেই জমি পুনরুদ্ধার করেছে।

দুদক জানিয়েছে, গত ১৬ জানুয়ারি আদালতের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া অন্যান্য সম্পদ জব্দের বিষয়েও আদালতকে সম্পূরক তথ্য দেওয়া হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা