আমরা প্রায়ই শুনি—জাতিসংঘ বা জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিভিন্ন দেশকে ঋণ দিচ্ছে, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করছে কিংবা সংকটে থাকা রাষ্ট্রকে সহায়তা করছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, জাতিসংঘের এত টাকার উৎস আসলে কোথায়? জাতিসংঘ কি নিজে কোনো ব্যাংক, নাকি তারা নিজেরা টাকা ছাপে? বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘ নিজে সরাসরি ঋণ দেয় না; বরং জাতিসংঘ ব্যবস্থার আওতায় থাকা বিভিন্ন সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই অর্থায়নের কাজ করে।
জাতিসংঘের মূল অর্থের সবচেয়ে বড় উৎস হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর চাঁদা (Assessed Contributions)। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য দেশ ১৯৩টি, এবং প্রতিটি দেশকে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো ধনী দেশগুলো মোট বাজেটের বড় অংশ বহন করে। এই অর্থ মূলত জাতিসংঘের প্রশাসনিক খরচ, শান্তিরক্ষা মিশন এবং সাধারণ কার্যক্রম চালাতে ব্যবহৃত হয়।
এর বাইরে রয়েছে স্বেচ্ছা অনুদান (Voluntary Contributions), যা জাতিসংঘের প্রকল্পভিত্তিক কাজের প্রধান চালিকাশক্তি। UNICEF, UNDP, WHO, WFP-এর মতো সংস্থাগুলো সরকার, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এমনকি ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকেও অনুদান পায়। এই অর্থ ব্যবহার হয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন, শরণার্থী সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলার মতো খাতে।
যে ঋণের কথা আমরা বেশি শুনি, তার বড় অংশ আসে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) থেকে—যারা জাতিসংঘ ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলেও আলাদা আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংক ও IMF-এর অর্থের উৎস মূলত সদস্য দেশগুলোর মূলধন বিনিয়োগ, বার্ষিক চাঁদা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার থেকে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ। উন্নত দেশগুলো এখানে বড় শেয়ারহোল্ডার হওয়ায় ঋণ ও নীতিগত সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাবও বেশি থাকে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতিসংঘ নিজে লাভ করার জন্য ব্যবসা করে না। তাদের অর্থনৈতিক শক্তি আসলে বিশ্বের দেশগুলোর সম্মিলিত অবদান ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন। তাই বলা যায়, জাতিসংঘের “টাকা” কোনো একক উৎস থেকে আসে না; এটি আসে রাষ্ট্রগুলোর করের অর্থ, দাতাদের অনুদান এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সম্মিলিত কাঠামো থেকে। এই ব্যবস্থাই জাতিসংঘকে বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা দেয়।