দক্ষিণ আমেরিকার ঠিক মাঝখানে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত এক দেশ— বলিভিয়া। একে বলা হয় ‘তিব্বত অফ দি আমেরিকাস’। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘেদের আনাগোনা আর আদিম ইনকা সভ্যতার ঐতিহ্যে ঘেরা এই দেশটি যেন এক অন্য গ্রহের টুকরো। বলিভিয়া মানেই কেবল রুক্ষ পাহাড় নয়, বরং এটি পৃথিবীর এমন এক জায়গা যেখানে বাস্তব আর কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। যেখানে ঘড়ির কাঁটা উল্টো ঘোরে আর মরুভূমি হয়ে ওঠে কাঁচের আয়না!
চলুন জেনে নেওয়া যাক বৈচিত্র্যময় বলিভিয়া সম্পর্কে ৫টি চমকপ্রদ তথ্য:
১. সালার দে উইউনি: পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক আয়না
বলিভিয়ার সালার দে উইউনি (Salar de Uyuni) হলো বিশ্বের বৃহত্তম লবণের মরুভূমি। প্রায় ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই লবণের চাদর যখন বর্ষাকালে সামান্য জলে ভিজে যায়, তখন এটি পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক আয়নায় পরিণত হয়। ওপরের আকাশ আর নিচের মাটির পার্থক্য তখন মুছে যায়; মনে হবে আপনি মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটছেন। মহাকাশচারীরা যখন চাঁদ থেকে পৃথিবীকে দেখেন, তখন এই সাদা মরুভূমিটি উজ্জ্বলভাবে জ্বলজ্বল করতে দেখা যায়।
২. যেখানে ঘড়ির কাঁটা উল্টো ঘোরে!
বলিভিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী লা পাজ-এর ‘ন্যাশনাল কংগ্রেস’ ভবনের চূড়ায় একটি ঘড়ি আছে, যার কাঁটাগুলো সাধারণ ঘড়ির ঠিক উল্টো দিকে (Counter-clockwise) ঘোরে! এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাউদার্ন ক্লক’ বা দক্ষিণের ঘড়ি। বলিভিয়া সরকার এটি পরিবর্তন করেছিল এই বার্তা দিতে যে, দক্ষিণ গোলার্ধের মানুষ হিসেবে তারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য আর ভিন্নতাকে সম্মান করে এবং তারা উত্তর গোলার্ধের নিয়ম মানতে বাধ্য নয়।
৩. ৩৭টি সরকারি ভাষার দেশ
বলিভিয়া বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় দেশ। এখানে কেবল স্প্যানিশ নয়, বরং সব মিলিয়ে ৩৭টি সরকারি ভাষা রয়েছে! এর মধ্যে ৩৬টিই হলো বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর ভাষা (যেমন: কেচুয়া, আয়মারা)। ২০০৯ সালে দেশটির নতুন সংবিধানে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যাতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতি আর পরিচয় হারিয়ে না যায়। এই কারণেই দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্লুরিন্যাশনাল স্টেট অফ বলিভিয়া’ বলা হয়।
৪. গোলাপী ডলফিনের আদি নিবাস
অনেকেই অবাক হন যে, পাহাড়ি দেশ বলিভিয়ায় অ্যামাজন রেইনফরেস্টের একটি বিশাল অংশ রয়েছে। এখানকার নদীতে দেখা মেলে বিশ্বের বিরলতম গোলাপী ডলফিনের (Bolivian Pink Dolphin)। স্থানীয় লোকগাঁথা অনুযায়ী, এই ডলফিনগুলো রাতে সুদর্শন পুরুষে রূপান্তরিত হয়ে মানুষকে মুগ্ধ করে! বলিভিয়া সরকার এই ডলফিনগুলোকে তাদের জাতীয় প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।
৫. মেঘের ওপর দিয়ে যাতায়াত: মি টেলেফেরিও
লা পাজ শহরটি এত উঁচু-নিচু আর পাহাড় ঘেরা যে সেখানে সাধারণ বাস বা ট্রেন চালানো খুব কঠিন। তাই বলিভিয়া গড়ে তুলেছে বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সর্বোচ্চ আরবান ক্যাবল কার নেটওয়ার্ক, যার নাম ‘মি টেলেফেরিও’ (Mi Teleférico)। এখানে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য মাটির নিচে মেট্রোর বদলে মেঘের ওপর দিয়ে ক্যাবল কারে চড়ে যাতায়াত করে। ওপর থেকে পুরো শহরের দৃশ্যটি কোনো সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়।
বলিভিয়ার এই উল্টো ঘড়ি আর লবণের আয়না কি আপনাকে রোমাঞ্চিত করেছে? আন্দিজ পর্বতমালার এই রহস্যময় দেশটিতে একবার হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা কি আপনারও হয়?