মহিষ বনাম বইষ
বাহ্যিকভাবে একই প্রজাতির মনে হলেও লালন-পালন, শারীরবৃত্তীয় গঠন এবং সাংস্কৃতিক ব্যবহারের দিক থেকে সমতলের সাধারণ মহিষ এবং চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় চরাঞ্চলের ‘বইষ’-এর মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। প্রমিত বাংলায় যা মহিষ নামে পরিচিত, চট্টগ্রাম অঞ্চল ও তার সংলগ্ন চরাঞ্চলে তা কেবল একটি আঞ্চলিক উচ্চারণের নাম নয়; বরং জীবনযাত্রা ও বাথান সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে ‘বইষ’ নিজস্ব কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য বহন করে।
শারীরিক গঠন ও জাতের দিক থেকে বিবেচনা করলে, সমতল ভূমিতে পালিত মহিষগুলো প্রধানত নদীজাতীয় বা মিশ্র জাতের হয়ে থাকে। এগুলোর শরীর সুগঠিত এবং শিংগুলো সাধারণত বাঁকানো ও বৃত্তাকার। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, আনোয়ারা, বাঁশখালী বা কক্সবাজারের উপকূলীয় চরাঞ্চলে বিচরণকারী ‘বইষ’ মূলত জলাভূমি বা চরাঞ্চলের বিশেষ জাতের। প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার জন্য বইষের শারীরিক গঠন অত্যন্ত শক্তপোক্ত হয় এবং এদের শিংগুলো মাথার দু’পাশে ছড়ানো ও খানিকটা চ্যাপ্টা প্রকৃতির হয়।
বাসস্থান ও খাদ্যাভ্যাসেও এদের বড় ব্যবধান দৃশ্যমান। সাধারণ মহিষ গৃহস্থালির গোয়ালঘরে থেকে খড়, চাষ করা সবুজ ঘাস ও দানাদার খাবার খেয়ে বেড়ে ওঠে। কিন্তু চাটগাঁইয়া ‘বইষ’-এর জীবন কাটে নদীর মোহনা বা সমুদ্র উপকূলের উন্মুক্ত ‘বাথানে’। বাথানের বইষ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে লোনা পানির ঘাস ও পলিমাটির মেঠো উদ্ভিদ খেয়ে জীবনধারণ করে এবং দিনের দীর্ঘ সময় কাদাপানিতে কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই প্রাকৃতিক পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের কারণেই এদের সহ্যক্ষমতা সমতলের মহিষের চেয়ে অনেক বেশি।
উৎপাদিত দুধ ও মাংসের গুণগত মানেও এই দুইয়ের রূপ আলাদা। গৃহপালিত মহিষের দুধ দৈনন্দিন চাহিদার জন্য উপযোগী হলেও, বাথানে চরে বেড়ানো বইষের দুধ অত্যন্ত ঘন এবং এতে চর্বির পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। এই দুধ দিয়েই তৈরি হয় চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলের বিখ্যাত ‘পাতিল দই’ ও মাখন। এছাড়া চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানি সংস্কৃতিতে বইষের মাংসের আলাদা একটি কদর রয়েছে। উন্মুক্ত চরাঞ্চলে প্রাকৃতিক খাবারে বড় হওয়া বইষের মাংসের টেক্সচার ও স্বাদ মেজবানি মশলার সাথে অপূর্ব এক মেলবন্ধন তৈরি করে, যা সাধারণ মহিষের মাংস থেকে কিছুটা পৃথক।
সব মিলিয়ে, সমতলের মহিষ যেখানে কেবল একটি দুগ্ধ ও কৃষিভিত্তিক গৃহপালিত প্রাণী, সেখানে চাটগাঁর ‘বইষ’ উপকূলীয় বাথান অর্থনীতি, মেজবানি কৃষ্টি এবং লোকজ জীবনসংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।