বিশাল সম্ভাবনা সত্ত্বেও কেন পিছিয়ে বাংলাদেশের ই-কমার্স?
বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতের বাজার প্রতিনিয়ত বড় হলেও আন্তর্জাতিক মানের সাথে তুলনা করলে এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আটকে আছে। অ্যামাজন (Amazon), আলিবাবা (Alibaba) বা ইবে (eBay)-এর মতো বিশ্বসেরা প্ল্যাটফর্মগুলো যখন গ্রাহক ট্রাস্ট ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে, তখন বাংলাদেশের অধিকাংশ প্ল্যাটফর্ম কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিত্তিক কেনাবেচা বা দুর্বল ওয়েবসাইটে সীমাবদ্ধ থাকছে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিভিত্তিক এই খাতে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও উদ্যোক্তাদের কিছু মৌলিক ভুল এবং উদাসীনতা খাতটির বিকাশকে স্থবির করে রেখেছে।
ই-কমার্স উদ্যোক্তারা ঠিক কোথায় ভুল করছেন?
-
টেকসই বিজনেসের বদলে প্রমোশন নির্ভরতা: অধিকাংশ দেশীয় ই-কমার্স উদ্যোক্তা একটি সুনির্দিষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদী বিজনেস মডেল তৈরির আগেই বিজ্ঞাপন ও ক্যাশব্যাক/ডিসকাউন্টে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। গ্রাহককে মানসম্মত সেবার বদলে সাময়িক ছাড়ে অভ্যস্ত করায় পণ্যের দাম বাড়লেই গ্রাহক হারিয়ে যায়।
-
দুর্বল লজিস্টিকস ও ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা: আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর মূল শক্তি তাদের সঠিক সময়ে নিখুঁত ডেলিভারি। বাংলাদেশে এখনো দ্রুত, নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী ডেলিভারি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি। পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় এবং ক্যাশ অন ডেলিভারির ওপর অতি-নির্ভরতা ব্যবসার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
-
বিক্রয়োত্তর সেবা ও ‘কাস্টমার ট্রাস্ট’-এর অভাব: ই-কমার্সে ‘কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স’ই সব। ছবি দেখে এক পণ্য অর্ডার করে অন্য নিম্নমানের পণ্য পাওয়া, রিফান্ড পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করা কিংবা কাস্টমার কেয়ার থেকে সঠিক সমাধান না পাওয়ার কারণে গ্রাহকরা ই-কমার্সের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছেন।
-
পেশাদার ওয়েবসাইট ও ইউজার এক্সপেরিয়েন্স (UX)-এ বিনিয়োগ না করা: শীর্ষ ই-কমার্স কোম্পানিগুলো ডেটা অ্যানালিটিক্স ও সহজ ইউজার ইন্টারফেস তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক উদ্যোক্তা পেজ বা সস্তা ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভর করে বড় স্কেলে ব্যবসা চালানোর চেষ্টা করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যর্থ হয়।
সাইবার নিরাপত্তার প্রতি এত অনীহা কেন?
অনলাইন কেনাকাটায় নিরাপত্তা সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ ই-কমার্স উদ্যোক্তার কাছে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়টি চরম উপেক্ষিত। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:
-
নিরাপত্তাকে ‘খরচ’ মনে করা, ‘বিনিয়োগ’ নয়: বেশিরভাগ উদ্যোক্তা সাইবার নিরাপত্তাকে অনর্থক বাড়তি খরচ হিসেবে দেখেন। ফায়ারওয়াল, নিয়মিত সিকিউরিটি অডিট বা ডেটা এনক্রিপশনের পেছনে টাকা খরচ না করে তারা সেই টাকা মার্কেটিংয়ে খরচ করতেই বেশি পছন্দ করেন।
-
সচেতনতা ও দক্ষ জনবলের অভাব: অধিকাংশ ছোট ও মাঝারি ই-কমার্স সাইট তৈরি করা হয় অত্যন্ত সাধারণ ও দুর্বল কোডিং দিয়ে, যেখানে প্রাথমিক সিকিউরিটি প্রটোকল (যেমন: SSL, Data Encryption, Multi-Factor Authentication) সঠিকভাবে কনফিগার করা থাকে না।
-
গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তায় উদাসীনতা: গ্রাহকের নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা এমনকি কার্ডের তথ্যের মতো স্পর্শকাতর ডেটা সুরক্ষিত রাখা যে আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব—এ বিষয়ে অনেক উদ্যোক্তার ধারণা স্পষ্ট নয়।
-
কঠোর আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহিতার অভাব: সাইবার অ্যাটাক বা ডেটা ব্রিচ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোম্পানিগুলোকে মোটা অঙ্কের জরিমানা ও আইনি মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু স্থানীয় বাজারে জবাবদিহিতা ও আইনি তদারকি শিথিল থাকায় নিরাপত্তা জোরদারে উদ্যোক্তাদের মধ্যে তাগিদ কম থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে টেক্কা দিতে হলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সস্তা প্রচারণার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং উন্নত কাস্টমার সার্ভিস—এই তিন মূল স্তম্ভের ওপর জোর দিতে হবে।
আইটি অবকাঠামো শক্তিশালী করা, ডেটা সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা এবং একটি বিশ্বস্ত ডেলিভারি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারলেই কেবল বাংলাদেশের ই-কমার্স বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারবে।