সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত নীতিবাক্যের খৈ ফোটানো আর ধার্মিকতার চাদর গায়ে জড়ানো এক ব্যক্তি হঠাৎ করেই বন্দরনগরী চট্টগ্রামে টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছেন। তাঁর নাম কাজী মনজু, তবে অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ‘ডিজে মনজু’ নামে। সাধারণ মানুষের কাছে নিজেকে একজন ‘মোবাইল ব্যবসায়ী’ হিসেবে পরিচয় দিলেও তার পর্দার আড়ালের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অন্ধকার। আমাদের অনুসন্ধানে এবং হাতে আসা একাধিক অকাট্য তথ্য-প্রমাণে এই মনজুর যে ভয়ঙ্কর ও দ্বিমুখী রূপ উন্মোচিত হয়েছে, তা এককথায় গা শিউরে ওঠার মতো।
হোয়াটসঅ্যাপে যৌনকর্মী সাপ্লাই ও বিকাশ লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ
ফেসবুকে সাধু সাজার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও কাজী মনজুর পার্সোনাল হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইলের চ্যাট হিস্ট্রি ঘেঁটে দেখা গেছে এক চরম আপত্তিকর চিত্র। শহরের নামী-দামী ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন খদ্দেরদের কাছে নিয়মিত বিভিন্ন বয়সী মেয়ে এবং যৌনকর্মী সাপ্লাই দেওয়ার অফার করে আসছিলেন এই মনজু।

শুধু অফার করাই নয়, বিভিন্ন খদ্দেরকে হরেক রকমের তরুণীর ছবি ও প্রোফাইল পাঠানো, পরবর্তীতে ডিল ফাইনাল করে অগ্রিম টাকা নেওয়ার জন্য বিকাশ নম্বর আদান-প্রদানের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। আরও মারাত্মক বিষয় হলো, খদ্দেরের ডেরায় কিংবা হোটেলে মেয়েদের পাঠানোর বিনিময়ে প্রাপ্ত টাকা কীভাবে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হবে, তা নিয়ে স্বয়ং ভুক্তভোগী মেয়েদের সাথে মনজুর দরকড়াকড়ি ও অশ্লীল কথোপকথনের তথ্যও এখন প্রকাশ্য। তাঁর ফোনের গ্যালারিতে জমা হয়ে আছে কয়েকশো মেয়ের ছবি, যা তিনি খদ্দেরদের কাছে ‘ক্যাটালগ’ হিসেবে বিলিয়ে বেড়াতেন।
সিসা লাভার থেকে বঙ্গবন্ধু সৈনিক: মনজুর বহুরূপী ব্যক্তিত্ব
কাজী মনজুর ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলটি যেন একেকটি রূপকথার চরিত্র। নিজের স্বার্থ আর ধান্দা বজায় রাখতে তিনি যখন-তখন রঙ বদলান। প্রোফাইলের কোথাও তিনি নিজেকে পরম ধার্মিক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একনিষ্ঠ ভক্ত দাবি করেন, আবার কোথাও চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আবু সুফিয়ানের স্নেহধন্য হিসেবে জাহির করেন।

এক ফ্রেমে ফাইভ স্টার হোটেলে বসে আয়েশ করে সিসা টানার ভিডিও আপলোড করে নিজেকে আধুনিক ও প্রভাবশালী দেখানোর চেষ্টা করেন, তো পরক্ষণেই আবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নামে মাত্রাতিরিক্ত তেলবাজি করে পোস্ট দেন।
একাত্তর টিভির সেই চাঞ্চল্যকর খবর ও পুলিশি গ্রেফতার
মনজুর এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের গল্প নতুন কিছু নয়। গত ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গণমাধ্যম ‘একাত্তর টিভি’সহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে কাজী মনজুকে নিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর খবর ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচারিত হয়। সেদিন মধ্যরাতে নগরীর ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকার ‘ইয়াকুব ট্রেড সেন্টারে’ পাঁচলাইশ থানা পুলিশ এক ঝটিকা অভিযান চালায়। সেখান থেকে দেশি-বিদেশি বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও প্রায় ২৫ থেকে ২৬ জন নারী-পুরুষসহ অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায় হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয় এই কাজী মনজুকে।

সে সময় প্রতিজন ১ হাজার ৫০০ টাকা করে টিকিট কেটে ওই উশৃঙ্খল ‘ডিজে পার্টিতে’ যোগ দিয়েছিল। ভবনের ৬ তলার ওই ফ্লোরটিতে অভিযানের পর তৎকালীন পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, মনজু নিজেই ৫০ হাজার টাকায় ফ্লোরটি ভাড়া নিয়ে ‘পার্টি’র নাম দিয়ে মূলত নারীদের মাধ্যমে চরম অশ্লীল ও অনৈতিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল।
মিথ্যা মামলার নাটক: ফেঁসে গেলেন নিজেই!
সম্প্রতি এই ডিজে মনজু আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এক নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়ে। চকবাজার থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রাহাত উল্লাহ রবিনের বিরুদ্ধে ৬৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও মারধরের অভিযোগ এনে নগরের কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা ঠুকে দেন মনজু। মামলায় তিনি দাবি করেন, রবিন তাকে রিয়াজউদ্দিন বাজারে ডেকে নিয়ে মারধর করেছেন। কিন্তু এবারও ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণের কাছে মুখ থুবড়ে পড়েছে মনজুর সাজানো নাটক। আমাদের হাতে আসা কল রেকর্ড ও চ্যাট স্ক্রিনশট বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। সেদিন রবিন মনজুকে ডাকেননি, বরং উল্টো কাজী মনজুই চরম আকুতি-মিনতি করে রবিনকে রিয়াজউদ্দিন বাজারে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

কাজী মনজু ওরফে ডিজে মনজুর এই সামগ্রিক কর্মকাণ্ড দেখে সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহলের মনে তীব্র প্রশ্ন জেগেছে—এ কেমন বিচিত্র ও ভয়ঙ্কর চরিত্রের মানুষ? যার ব্যক্তিত্বকে কোনো চেনা সংজ্ঞা দিয়ে মেলানো সম্ভব হচ্ছে না।
যিনি ক্যামেরার সামনে ধার্মিক ও সমাজ সংস্কারক, অথচ ক্যামেরার পেছনে অন্ধকার জগতের ডন আর দেহব্যবসায়ীদের সর্দার! একদিকে সাধারণ মোবাইল ব্যবসায়ী, অন্যদিকে তরুণীদের ইজ্জত নিয়ে ব্যবসা করা এক নিখুঁত অপরাধী। চাটুকারিতা আর মুখোশধারী এই অপরাধীর আসল রূপ উন্মোচনের পর এখন তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলছেন চট্টগ্রামের সচেতন সমাজ।
