Home » বর্জ্যের চাদরে বাকলিয়া

বর্জ্যের চাদরে বাকলিয়া

নালা-নর্দমার বিষাক্ত স্তূপ যেভাবে ছড়াচ্ছে মরণব্যাধি

0 comments 472 views
A+A-
Reset

চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার রাস্তাঘাট ও পরিবেশের চরম বিপর্যয় স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলাকার প্রতিটি মোড়ে যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পলিথিন ব্যাগ, খোলা জায়গায় পচে দুর্গন্ধ ছড়ানো গৃহস্থালির বর্জ্য এবং প্লাস্টিকের স্তূপ এখানকার পুরো নর্দমা ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়েছে। এর ওপর বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনী হ্যান্ডবিল ও পোস্টারগুলো নালার ভেজা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে পচে একধরনের ঘন কাদার মতো স্তর তৈরি করছে, যা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিচ্ছে। পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাব এবং জনসাধারণের খামখেয়ালিপনার কারণে বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত এসব বর্জ্য সরাসরি নালা-নর্দমা ও খালে ফেলছেন। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ নাগরিক সমস্যা মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি নীরব টাইম বোমা যা পুরো জনগোষ্ঠীকে ধাবিত করছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে।

কোনো প্রকার উপলব্ধি ছাড়াই স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিদিন এই বিষাক্ত বাতাস ও বর্জ্যের সান্নিধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন, যা শরীরে নানা জটিল রোগ বাসা বাঁধার প্রধান কারণ। দীর্ঘদিন এই নোংরা পরিবেশের সংস্পর্শে থাকার কারণে হৃদরোগ, ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, প্রজনন সমস্যা বা বন্ধ্যাত্ব এবং বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ফলে বাকলিয়ার অসংখ্য পরিবার প্রতিরোধযোগ্য এসব দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। যদিও নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক সরাসরি সব রোগীর চিকিৎসার নথি আলাদাভাবে সংরক্ষিত নেই, তবুও অব্যবস্থাপনাজনিত বর্জ্যের সাথে স্বাস্থ্যহানির এই সরাসরি বৈজ্ঞানিক সম্পর্ককে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এই সংকটের ভয়াবহতা অনুধাবনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ডব্লিউএইচও’র পরিসংখ্যান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্থাটির মতে, বিশ্বের মোট মৃত্যুর প্রায় ২৪ শতাংশেরই প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ এবং বায়ুমণ্ডলের অবক্ষয়ের মতো পরিবেশগত বিপর্যয়। ডব্লিউএইচও দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে, খোলা জায়গায় প্লাস্টিক ও লেমিনেটেড বিজ্ঞাপনী পোস্টার পচানো বা পোড়ানো হলে তা থেকে ‘ডাইঅক্সিন’ ও ‘ফিউরান’-এর মতো অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগ নির্গত হয়, যা সরাসরি ক্যান্সার সৃষ্টি করে। এছাড়া, এসব প্লাস্টিক ভেঙে যখন ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকে’ পরিণত হয়, তখন তা অনায়াসে ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটিতে মিশে যায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, এই অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো মানুষের শরীরে হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী গ্রন্থি এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর এর ক্ষতি করে, যা বৈশ্বিক স্তরে বন্ধ্যাত্ব, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং কিডনি বিকলের অন্যতম প্রধান কারণ।

সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা চট্টগ্রামের জলাবদ্ধ নর্দমা ব্যবস্থা, বিশেষ করে বাকলিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া চাক্তাই খালের সংযোগকারী নালাগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পচে যাওয়া কাগজের বিজ্ঞাপনে যখন এই জলপথগুলো অবরুদ্ধ হয়, তখন জমে থাকা বিষাক্ত ও রাসায়নিকযুক্ত পানি মারাত্মক সব রোগজীবাণুর প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এর সাথে যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও পচা বর্জ্যের গ্যাস মিলে পুরো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এক শ্বাসরুদ্ধকর ও বিষাক্ত পরিবেশের সৃষ্টি করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট কেবল একক কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়; এর জন্য বাকলিয়ার বাসিন্দাদের তাৎক্ষণিক নাগরিক সচেতনতা প্রয়োজন। নিজেদের দৈনিক বর্জ্য ফেলার ক্ষেত্রে ন্যূনতম দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন এখন আর কেবল এলাকা পরিষ্কার রাখার বিষয় নয়, বরং এটি আক্ষরিক অর্থেই আমাদের বেঁচে থাকার লড়াই।

You may also like

Leave a Comment

সম্পাদক: দাঊদ আরমান

অফিস: গুলজার টাওয়ার (২য় তলা), চট্টেশ্বরী রোড, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

ইমেইল: khobor24ghontabangla@gmail.com

Latest Articles

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
©
খবর ২৪ ঘণ্টা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত (২০২৪ – ২০২৬)
Registration No.: 391/2025-26

Developed BY  Netfie.com