যৌন ক্ষমতা হারিয়ে মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত মাদকসেবীরা
গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য
মাদকের মরণকামড় কেবল একজন মানুষের আয়ু কিংবা শারীরিক স্বাস্থ্যই কেড়ে নিচ্ছে না, তা নিঃশব্দে ধংস করে দিচ্ছে তরুণ প্রজন্মের যৌন জীবন ও প্রজনন ক্ষমতা। ইয়াবা, গাজা, অ্যালকোহল, হেরোইন কিংবা আইসের মতো প্রাণঘাতী নেশায় আসক্ত তরুণ-তরুণীরা অজান্তেই স্থায়ীভাবে যৌন অক্ষমতার দিকে ধাবিত হচ্ছেন। পরিণতিতে চরম পারিবারিক অশান্তি, বন্ধ্যাত্ব এবং তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগছেন তারা, যা একসময় তাদের ঠেলে দিচ্ছে আত্মহত্যার মুখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিনের সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদী মাদকসেবন মানুষের প্রজননতন্ত্রের ওপর সবচেয়ে মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, ইয়াবা ও আইসের মতো অ্যামফিটামিন জাতীয় মাদক রক্তের স্বাভাবিক সঞ্চালনে ব্যাঘাত ঘটায় এবং মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। ফলে পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণ একবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে এবং শুরু হয় স্থায়ী ‘ইরেকটাইল ডিসফাংশন’ বা লিঙ্গোত্থানজনিত অক্ষমতা। শুরুতে সাময়িক উদ্দীপনা মনে হলেও, কয়েক মাসের ব্যবধানেই এটি একজন তরুণকে পুরোপুরি নপুংসক করে তোলে। অন্যদিকে, যারা অতিরিক্ত মদ্যপান ও গাঁজায় আসক্ত, তাদের শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান এমন মাত্রায় হ্রাস পায় যে, সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা তারা চিরতরে হারিয়ে ফেলেন।
কেবল তরুণরাই নন, মাদকের এই ভয়াল থাবায় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যও ধ্বংসের মুখে পড়ছে। বিশ্বজুড়ে প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গাঁজা, অ্যালকোহল কিংবা বিভিন্ন সিন্থেটিক ড্রাগে আসক্ত তরুণীদের ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা সময়ের আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এতে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ডিম্বাণু পরিপক্ক হওয়ার প্রক্রিয়া থমকে দাঁড়ায়। ফলে তারা অকাল বন্ধ্যাত্ব বা প্রজনন অক্ষমতার শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভধারণ সম্ভব হলেও গর্ভাবস্থায় জটিলতা দেখা দেয় এবং বিকলাঙ্গ বা মৃত সন্তান জন্মের ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।
ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইভিএফ সেন্টারগুলোর প্রতিবেদন ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা নিতে আসা তরুণ দম্পতিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই একসময় কোনো না কোনোভাবে মাদকের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞদের কাছে তারা স্বীকার করছেন যে, অতীতে ভুলবশত সেবন করা মাদকই আজ তাদের সন্তানসুখ থেকে বঞ্চিত করছে। আইভিএফ সেন্টারে হাজার হাজার ডলার খরচ করেও প্রজননতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতির কারণে তাদের বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।

‘খবর ২৪ ঘণ্টা’র নিজস্ব এক জনমত জরিপে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ তথ্য। নাম ও পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বেশ কয়েকজন তরুণ মাদকসেবী প্রতিবেদককে জানান, নিয়মিত মাদক সেবনের ফলে তারা এখন চরম যৌন সমস্যায় ভুগছেন। বিয়ের বয়স পার হলেও বা বিবাহিত জীবন বজায় রাখতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হচ্ছেন। কিন্তু সামাজিক আত্মসম্মান রক্ষা ও পরিবার-বন্ধুদের কাছে জানাজানি হওয়ার লজ্জায় তারা কাউকে কিছু বলতে পারছেন না, এমনকি ডাক্তারের কাছে যেতেও দ্বিধা করছেন। ভেতরে ভেতরে এই লজ্জাজনক ও কষ্টদায়ক সত্যিটি চেপে রাখতে গিয়ে তাদের আচরণে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক মানসিক বৈকল্য। বাইরে থেকে পরিবার ও সমাজ এটিকে কেবল মাদকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা মেজাজ খিটখিটে হওয়া মনে করলেও, মূলত যৌন অক্ষমতা প্রকাশ করতে না পারার চরম মানসিক যন্ত্রণা থেকেই তারা অদ্ভুত ও আশঙ্কাজনক আচরণ করছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভুল পথ থেকে ফিরে আসার সুযোগ এখনও আছে, তবে তা ফেলে রাখলে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাবে ভবিষ্যৎ জীবন। তাই লজ্জা বা ভয় না পেয়ে প্রথম সুযোগেই মাদক ত্যাগ করা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই একমাত্র উপায়।
সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
গুরুত্বপূর্ণ এই সংবাদটি অন্যদের জানাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।