Home » লোয়ার অ্যাবডোমিনে টিউমার হলে করনীয়

লোয়ার অ্যাবডোমিনে টিউমার হলে করনীয়

কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা

0 comments 366 views
A+A-
Reset
লোয়ার অ্যাবডোমিনে টিউমার হলে করনীয়

মানবদেহের অ্যাবডোমিনাল অঞ্চল হলো এমন একটি স্থান, যেখানে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একসঙ্গে কাজ করে। অ্যাবডোমিনাল অঞ্চল বলতে বোঝানো হয় মানবদেহের পেটের অংশ, যা বুক ও পেলভিসের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে শরীরের প্রধান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর একটি বড় অংশ অবস্থান করে। এই অঞ্চলে অন্ত্র, পাকস্থলী, লিভার, কিডনি, প্যানক্রিয়াস, প্লীহা, মূত্রথলি, এবং নারীদের ক্ষেত্রে জরায়ু ও ডিম্বাশয় অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলে টিউমার হলে তা শারীরিক অস্বস্তি, ব্যথা, এবং নানা জটিলতার কারণ হতে পারে।

এ আর্টিকেলে লোয়ার অ্যাবডোমিনের টিউমার কী, এর কারণ, লক্ষণ, নির্ণয়ের পদ্ধতি এবং চিকিৎসার বিস্তারিত আলোচনা করা হবে, যা এই বিষয়ে সাধারণ ধারণা গঠনে সহায়তা করবে।

অ্যাবডোমিনাল টিউমার কী?

অ্যাবডোমিনাল টিউমার হলো পেটের নীচের অংশে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট একধরনের পিণ্ড বা গঠন। এটি বিনাইন (ক্ষতিকারক নয়) বা ম্যালিগন্যান্ট (ক্ষতিকারক বা ক্যান্সারজনিত) হতে পারে।

A giant, rapidly growing intra‑abdominal desmoid tumor of mesenteric origin  in an adolescent male: A case report and literature review

ক্যান্সারের ঝুঁকি কতটুকু?

সব টিউমার ক্যান্সার নয়। তবে কিছু টিউমার ম্যালিগন্যান্ট হয়ে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।

  • বিনাইন টিউমার: ক্ষতিকারক নয়, তবে বড় হলে পেটে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
  • ম্যালিগন্যান্ট টিউমার: ক্যান্সার হতে পারে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ক্যান্সারের ঝুঁকি নির্ভর করে টিউমারের ধরণ, আকার, এবং অবস্থানের ওপর। চিকিৎসক টিস্যু বায়োপসি এবং অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন এটি ক্যান্সার কিনা।

এটি হওয়ার কারণ কী?

লোয়ার অ্যাবডোমিন অঞ্চলে টিউমার বা অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর মধ্যে কিছু সাধারণ কারণ নিচে বর্ণনা করা হলো:

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

শরীরে হরমোনের অতিরিক্ত বা ঘাটতি বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রভাব ফেলে। যেমন, ইস্ট্রোজেন বা প্রোজেস্টেরনের ভারসাম্যহীনতা ডিম্বাশয়ে সিস্ট বা টিউমার তৈরি করতে পারে।

জেনেটিক কারণ

পরিবারে কারও যদি ডিম্বাশয়ের টিউমার, ফাইব্রয়েড বা ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে, তবে এই ঝুঁকি উত্তরাধিকারসূত্রে বৃদ্ধি পায়।

Lower Right Abdominal Pain in Women: Symptoms, Causes & Treatments |  Thomson Medical

পেলভিক ইনফ্লেমেটরি ডিজিজ (PID)

PID হলো প্রজনন অঙ্গগুলোর প্রদাহজনিত একটি রোগ, যা সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়। এটি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে অ্যাবডোমিনাল অঞ্চলে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

ডিম্বাশয়ের সিস্ট বা টিউমার

ডিম্বাশয়ের মধ্যে তরলপূর্ণ সিস্ট বা টিউমার হতে পারে। এটি সাধারণত নিরীহ হলেও, বড় হলে ব্যথা বা প্রজনন সমস্যার কারণ হতে পারে।

ফাইব্রয়েড (গর্ভাশয়ের টিউমার)

গর্ভাশয়ের মাংসপেশিতে সৃষ্ট বিনাইন টিউমারকে ফাইব্রয়েড বলে। এটি সাধারণত ক্যান্সার নয়, তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, ব্যথা, এবং প্রজনন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

অতিরিক্ত ওজন বা অপুষ্টি

অতিরিক্ত ওজন শরীরের হরমোনে পরিবর্তন আনতে পারে, যা টিউমার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে, অপুষ্টি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যা টিউমার সৃষ্টি বা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন

ধূমপান শরীরের কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করে, যা টিউমার সৃষ্টির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, এবং ব্যায়ামের অভাব অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ, যা এই ধরনের সমস্যা বাড়ায়।

রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

টিউমার সনাক্ত করতে চিকিৎসক নিচের পরীক্ষাগুলো সুপারিশ করতে পারেন:

  • আলট্রাসনোগ্রাফি (USG): পেটের ভেতরের গঠন দেখার জন্য।
  • সিটি স্ক্যান (CT Scan): টিউমারের আকার এবং প্রকৃতি জানতে।
  • এমআরআই (MRI): টিউমার কোথায় অবস্থিত এবং কতটা ছড়িয়েছে তা নির্ণয়ে।
  • টিউমার মার্কার টেস্ট: রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সারের উপস্থিতি নির্ধারণ করা।
  • বায়োপসি: টিউমারের কোষ সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা।
  • রক্ত পরীক্ষা: শরীরের সংক্রমণ বা অন্যান্য সমস্যা বোঝার জন্য।

What Causes Lower Abdominal Pain In Females - Aether Health - Kingwood ER

চিকিৎসার পদ্ধতিসমূহ

টিউমারের ধরণ ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।

পর্যবেক্ষণ (Watchful Waiting):

ক্ষতিকারক নয় এমন টিউমার হলে চিকিৎসক কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

অপারেশন (Surgery):

  • বড় বা সমস্যাযুক্ত টিউমার অপসারণে সাধারণত সার্জারি প্রয়োজন।
  • ল্যাপারোস্কোপিক বা খোলা পদ্ধতিতে অপারেশন করা হয়।

কেমোথেরাপি:

কেমোথেরাপি হলো একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে ক্যান্সারজনিত টিউমার ধ্বংস করতে শক্তিশালী রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এই ওষুধগুলো ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে থামিয়ে দেয় বা ধ্বংস করে।

লোয়ার অ্যাবডোমিন অঞ্চলে ক্যান্সার হলে, কেমোথেরাপি ক্যান্সার কোষের ডিএনএকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে তারা দ্রুত বিভাজন বা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা হারায়। এই পদ্ধতি টিউমারের আকার ছোট করতে এবং ক্যান্সারের বিস্তার ঠেকাতে সহায়তা করে।

তবে কেমোথেরাপি শুধু ক্যান্সার কোষেই প্রভাব ফেলে না; এটি শরীরের কিছু সুস্থ কোষেও প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে চুল ঝরা, বমি, দুর্বলতা, বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। চিকিৎসার ধরন এবং ওষুধের ডোজ নির্ভর করে ক্যান্সারের ধরণ, পর্যায় এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার উপর।

রেডিয়েশন থেরাপি:

রেডিয়েশন থেরাপি হলো একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে উচ্চ শক্তির এক্স-রে বা গামা রশ্মি ব্যবহার করা হয়। এই থেরাপি মূলত নির্দিষ্ট স্থানে ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি থামানো বা ধ্বংস করার জন্য কার্যকর।

লোয়ার অ্যাবডোমিন অঞ্চলের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রেডিয়েশন থেরাপি সরাসরি টিউমার লক্ষ্য করে প্রয়োগ করা হয়। এটি ক্যান্সার কোষের ডিএনএকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে তারা বিভাজন বা পুনরুৎপাদন করতে পারে না এবং ধীরে ধীরে মরে যায়।

এটি সাধারণত একা বা কেমোথেরাপির সঙ্গে সমন্বয়ে ব্যবহার করা হয়। যদিও এই থেরাপি ক্যান্সার কোষে প্রভাব ফেলে, এটি আশপাশের সুস্থ কোষেও সামান্য ক্ষতি করতে পারে, যার ফলে ত্বকের লালচে হওয়া, ক্লান্তি, বা ওই অঞ্চলে ব্যথার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সঠিক পরিকল্পনায় এটি অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে।

হরমোন থেরাপি:

হরমোন থেরাপি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে হরমোনের কার্যকলাপ কমানো বা বন্ধ করার মাধ্যমে টিউমারের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটি সাধারণত হরমোন-নির্ভর ক্যান্সার, যেমন ডিম্বাশয় বা জরায়ুর টিউমারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

লোয়ার অ্যাবডোমিন অঞ্চলে টিউমারের ক্ষেত্রে, যদি হরমোন (যেমন ইস্ট্রোজেন বা প্রোজেস্টেরন) টিউমারের বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে, তবে হরমোন থেরাপি সেই হরমোনের মাত্রা কমিয়ে বা রিসেপ্টরগুলোর কার্যক্ষমতা বন্ধ করে দেয়।

এই থেরাপি বিভিন্ন ধরনের ওষুধের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেমন:

  • হরমোন উৎপাদন বন্ধ করার ওষুধ।
  • রিসেপ্টর ব্লকার, যা হরমোনকে কোষে কাজ করতে বাধা দেয়।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে গরম অনুভব, ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, এবং মেজাজের পরিবর্তন। এটি এককভাবে বা কেমোথেরাপি এবং সার্জারির সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করা হতে পারে, নির্ভর করে টিউমারের প্রকৃতি ও অবস্থার ওপর।

জীবনধারা পরিবর্তনের গুরুত্ব

  • পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
  • নিয়মিত শরীরচর্চা
  • ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা

লোয়ার অ্যাবডোমিনের টিউমার একটি জটিল সমস্যা হলেও সঠিক সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

লেখক: দাঊদ আরমান,
মেডিকেল ভ্যালু ট্রাভেল কনসালটেন্ট, প্রাইম মিডিয়াকেয়ার

You may also like

Leave a Comment

সম্পাদক: দাঊদ আরমান

অফিস: গুলজার টাওয়ার (২য় তলা), চট্টেশ্বরী রোড, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

ইমেইল: khobor24ghontabangla@gmail.com

Latest Articles

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
©
খবর ২৪ ঘণ্টা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত (২০২৪ – ২০২৬)
Registration No.: 391/2025-26

Developed BY  Netfie.com