গত কয়েক বছরে প্রজনন স্বাস্থ্যের চিত্র নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৬ সালে এসে বন্ধ্যাত্ব আর শুধু দেরিতে বিয়ে বা বেশি বয়সে সন্তান নেওয়ার সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্বজুড়ে প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে একজন বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগছেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে Assisted Reproductive Technology (ART), বিশেষ করে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF)-এর ব্যবহার রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। ১৯৭৮ সালে প্রথম সফল IVF শিশুর জন্মের পর ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে আনুমানিক ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ শিশু এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক ও জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোতে বর্তমানে মোট জীবিত জন্মের প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশই IVF-এর মাধ্যমে হচ্ছে, যা আধুনিক প্রজনন চিকিৎসায় এই পদ্ধতির অপরিহার্যতা স্পষ্ট করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্ধ্যাত্ব বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে এক ধরনের “পারফেক্ট স্টর্ম”—জৈবিক, পরিবেশগত ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব। উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারের কারণে অনেক দম্পতি ত্রিশের পর সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যখন স্বাভাবিক প্রজননক্ষমতা দ্রুত কমতে শুরু করে। এর পাশাপাশি পরিবেশে বাড়ছে হরমোন-বিঘ্নকারী টক্সিন, যেমন প্লাস্টিকজাত মাইক্রোপ্লাস্টিক, কীটনাশক এবং বায়ুদূষণ।
আধুনিক জীবনধারার আরেক বড় প্রভাব হচ্ছে স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। এসব কারণে নারী ও পুরুষ উভয়ের হরমোনাল ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বন্ধ্যাত্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে নারী-সম্পর্কিত কারণ, এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে পুরুষ-সম্পর্কিত কারণ এবং বাকি অংশ যৌথ বা অজানা কারণে হয়ে থাকে।
নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS), এন্ডোমেট্রিওসিস, ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া বা ডিম্বাশয়ের সক্ষমতা হ্রাস (Diminished Ovarian Reserve) এবং ফলোপিয়ান টিউব ব্লকেজের সমস্যা। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে কম স্পার্ম কাউন্ট, স্পার্মের গতিশীলতা ও গঠনগত ত্রুটি, ভেরিকোসিল, হরমোনাল ভারসাম্যহীনতা এবং স্পার্ম DNA fragmentation বন্ধ্যাত্বের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী দম্পতিরাও এখন ব্যাপকভাবে IVF ক্লিনিকের শরণাপন্ন হচ্ছেন—যে বয়সকে একসময় “প্রাইম ফার্টিলিটি এজ” বলা হতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে নীরব ও অচিহ্নিত রোগ যেমন PCOS বা এন্ডোমেট্রিওসিস, আজীবন মাইক্রোপ্লাস্টিক ও PFAS-এর সংস্পর্শ, অতিরিক্ত মানসিক চাপজনিত কর্টিসল হরমোনের বৃদ্ধি এবং প্রসেসড খাবারনির্ভর খাদ্যাভ্যাসের কারণে সৃষ্ট মেটাবলিক সমস্যা।
সব মিলিয়ে, আধুনিক বিশ্বের প্রজনন সংকট এখন আর কেবল ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিষয় নয়। এটি একটি সময়োপযোগী, সমন্বিত এবং উন্নত চিকিৎসা পরিকল্পনা ও জনসচেতনতার দাবি রাখছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
লেখক: দাঊদ আরমান
প্রেস এবং আইটি সম্পাদক, বাংলাদেশ মেডিকেল ট্যুরিজম এ্যাসোসিয়েশন – বিএমটিএ