ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। কিন্তু ফুটবলের মহোৎসব ফিফা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে সুন্দর এই খেলার আড়ালে মাঝেমধ্যেই দানা বেঁধেছে নানা বিতর্ক, অনিয়ম আর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। কোটি কোটি ভক্তের আবেগ যেখানে জড়িয়ে, সেখানে রেফারিদের ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা দুই দলের গোপন আঁতাত অনেক সময় টুর্নামেন্টের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। ফুটবল ইতিহাসের এমনই কিছু বিখ্যাত অনিয়ম ও বিতর্কিত ঘটনা নিয়ে এই প্রতিবেদন:
১. ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ (১৯৮৬ বিশ্বকাপ)
বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে, আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে। ম্যাচের ৫১তম মিনিটে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিল্পটনকে পরাস্ত করে একটি গোল করেন। রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা যায়, ম্যারাডোনা মাথা দিয়ে নয়, বরং হাত দিয়ে বল ঠেলে জালের ভেতরে বল পাঠিয়েছিলেন। ইংলিশ খেলোয়াড়রা তীব্র প্রতিবাদ করলেও তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের তা খেয়াল করেননি এবং গোলটি বহাল রাখেন। ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা নিজেই রসিকতা করে বলেছিলেন, গোলটি কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা আর কিছুটা ‘ঈশ্বরের হাতের’ সাহায্যে হয়েছিল।
২. দক্ষিণ কোরিয়ার বিতর্কিত সেমিফাইনাল (২০০২ বিশ্বকাপ)
২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনালে ওঠার সফরটি ছিল চরম বিতর্কিত। নকআউট পর্বে ইতালি এবং কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে রেফারিদের সিদ্ধান্তগুলো এতটাই একপেশে ছিল যে, ফুটবল বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। ইতালির বিপক্ষে ম্যাচে ফ্রান্সেসকো তোত্তিকে অন্যায়ভাবে লাল কার্ড দেওয়া এবং দামিয়ানো তোমাজির বৈধ গোল বাতিল করা হয়। এরপর স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে স্প্যানিশদের দুটি বৈধ গোল বাতিল করে দেন রেফারি। পরবর্তীতে ফিফা তদন্তে সেই ম্যাচগুলোর রেফারিদের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিং ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ ওঠে এবং এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
৩. ‘ডিসগ্রেস অব গিজঁ’ বা জার্মানি-অস্ট্রিয়া আঁতাত (১৯৮২ বিশ্বকাপ)
১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে কোনো রেফারি নয়, বরং দুটি দল মিলে সরাসরি দর্শকদের চোখের সামনে প্রতারণা করেছিল। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া মুখোমুখি হয়। সমীকরণ ছিল এমন— জার্মানি যদি ১ বা ২ গোলে জেতে, তবে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া দুই দলই পরের রাউন্ডে যাবে, আর বাদ পড়বে দুর্দান্ত খেলতে থাকা আলজেরিয়া। ম্যাচের ১০ মিনিটে জার্মানি ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর, বাকি ৮০ মিনিট দুই দলের খেলোয়াড়রা কেবল মাঠে বল নিয়ে অলসভাবে পাস পাস খেলে সময় পার করেন। গোল করার কোনো চেষ্টাই কেউ করেনি। এই নগ্ন আঁতাত ফুটবল বিশ্বে ‘ডিসগ্রেস অব গিজঁ’ নামে পরিচিত। এই ঘটনার পর থেকেই ফিফা নিয়ম করে যে, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে।
৪. ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ‘ভূতুড়ে গোল’
১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ড এবং পশ্চিম জার্মানির ম্যাচটি তখন ২-২ গোলে সমতায়। অতিরিক্ত সময়ে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্টের একটি শট জার্মানির গোলবারের ক্রসবারে লেগে গোললাইনের ঠিক ওপরে বা সামান্য বাইরে ড্রপ খেয়ে ফিরে আসে। রেফারি বুঝতে না পেরে লাইন্সম্যান তোফিক বাখরামভের (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) সাথে কথা বলে সেটিকে গোল ঘোষণা করেন। এই গোলের ওপর ভর করে ইংল্যান্ড ৪-২ ব্যবধানে চ্যাম্পিয়ন হয়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রমাণিত হয়েছে যে বলটি আসলে সম্পূর্ণ গোললাইন অতিক্রম করেনি। জার্মানি আজও এটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরি’ বলে মনে করে।
৫. চিলির কুখ্যাত গোলরক্ষকের নাটক (১৯৯০ বিশ্বকাপ বাছাই)
বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে ১৯৮৯ সালে বাছাইপর্বের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও চিলি। চিলিকে মূল পর্বে যেতে হলে এই ম্যাচে জিততেই হতো, কিন্তু ব্রাজিল ১-০ গোলে এগিয়ে যায়। এমন সময় হঠাত গ্যালারি থেকে একটা আতশবাজি (ফ্লেয়ার) চিলির গোলরক্ষক রবার্তো রোহাসের পাশে এসে পড়ে। রোহাস রক্তাক্ত অবস্থায় মাঠে লুটিয়ে পড়েন। চিলির খেলোয়াড়রা নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে মাঠ বর্জন করে। পরে ফিফার তদন্তে দেখা যায়, আতশবাজিটি রোহাসের গায়ে লাগেইনি! তিনি আগে থেকেই তার গ্লাভসের ভেতর একটি ব্লেড লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং ফ্লেয়ার পড়ার নাটক করে নিজেই নিজের কপাল কেটে রক্ত বের করেছিলেন, যাতে ব্রাজিলকে নিষিদ্ধ করে চিলিকে জয়ী ঘোষণা করা হয়। এই জালিয়াতির জন্য চিলিকে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং রোহাসকে আজীবন ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।