ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বিশ্বসেরা দলগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মঞ্চ। তবে এই মহোৎসবে যেমন রয়েছে ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা আর্জেন্টিনার মতো দলগুলোর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, ঠিক তেমনি কিছু দলের জন্য এটি আবার চরম হতাশা আর লজ্জার রেকর্ডও বয়ে এনেছে। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে পারফর্ম্যান্সের দিক থেকে সবচেয়ে বাজে বা তলানিতে থাকা দল হিসেবে ফুটবল বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে এশিয়ার দেশ দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদর। তবে একটি একক টুর্নামেন্টে সবচেয়ে জঘন্য পারফর্ম্যান্সের অনন্য রেকর্ডটি এখনো টিকে আছে জাইরে (বর্তমান কঙ্গো প্রজাতন্ত্র) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নামে।
নিচে ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে কিছু পারফর্ম্যান্সের খতিয়ান তুলে ধরা হলো:
১. বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে দল: দক্ষিণ কোরিয়া (১৯৫৪)
রেকর্ডের খাতা উল্টালে একটি একক টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার রেকর্ডটি রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার দখলে। ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নিয়েছিল দলটি। মাত্র দুটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়ে তারা হজম করেছিল অবিশ্বাস্য ১৬টি গোল, যার বিপরীতে নিজেরা একটি গোলও করতে পারেনি!
-
হাঙ্গেরি বনাম দক্ষিণ কোরিয়া: ৯-০ গোলে কোরিয়ার পরাজয়।
-
তুরস্ক বনাম দক্ষিণ কোরিয়া: ৭-০ গোলে কোরিয়ার পরাজয়।
দুই ম্যাচে মাইনাস ১৬ গোল ডিফারেন্স নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করা দক্ষিণ কোরিয়ার এই পারফর্ম্যান্সকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম পারফর্ম্যান্স হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও আধুনিক ফুটবলে দক্ষিণ কোরিয়া এখন এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি।
২. এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোল হজমের রেকর্ড: এল সালভাদর (১৯৮২)
বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো একটি ম্যাচে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারের এবং সবচেয়ে বেশি গোল হজম করার লজ্জাজনক রেকর্ডটি স্পেনের ১৯৮২ বিশ্বকাপে গড়েছিল এল সালভাদর। হাঙ্গেরির বিপক্ষে সেই ম্যাচে তারা ১০-১ ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর কোনো দল এক ম্যাচে ১০টি গোল হজম করেনি। সেই টুর্নামেন্টে ৩ ম্যাচের সবকটিতে হেরে ১৩টি গোল খেয়েছিল তারা, আর দিতে পেরেছিল মাত্র ১টি গোল।
৩. জাইরের বিপর্যয় (১৯৭৪)
১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপে আফ্রিকার দেশ জাইরে (বর্তমানে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো) অংশ নিয়ে তৈরি করেছিল এক অদ্ভুত ও করুণ ইতিহাস। গ্রুপ পর্বে তারা ৩টি ম্যাচ খেলে কোনো গোল না করেই হজম করে ১৪টি গোল। এর মধ্যে যুগোস্লাভিয়ার কাছে তারা হেরেছিল ৯-০ ব্যবধানে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে তাদের এক খেলোয়াড়ের ফ্রি-কিক নেওয়ার আগে দৌড়ে এসে বল লাথি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি আজও বিশ্বকাপের সবচেয়ে হাস্যকর মুহূর্তগুলোর একটি। পরে জানা যায়, দেশের স্বৈরশাসক তাদের হুমকি দিয়েছিলেন ৩ গোলের বেশি ব্যবধানে হারলে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না, সেই ভয়েই তারা এমন অদ্ভুত আচরণ করেছিলেন।
৪. কোনো গোল না করে সবচেয়ে বেশি গোল হজম: কানাডা ও চীন
বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে একটি গোলও করতে না পারার রেকর্ড রয়েছে বেশ কিছু দলের। এর মধ্যে ২০০২ বিশ্বকাপে চীন কোনো গোল করতে না পেরে ৯টি গোল হজম করেছিল। অন্যদিকে কানাডা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে কোনো গোল না করে ৫টি গোল হজম করে বিদায় নেয়।
সামগ্রিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে পিছিয়ে কারা?
যদি একাধিক বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর সামগ্রিক পারফর্ম্যান্সের গড় হিসাব করা হয়, তবে এল সালভাদর এবং নিউজিল্যান্ড ইতিহাসের সবচেয়ে তলানিতে থাকা দলগুলোর অন্যতম। এল সালভাদর দুটি বিশ্বকাপে মোট ৬টি ম্যাচ খেলে ৬টিতেই হেরেছে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড দুটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ৬টি ম্যাচের একটিতেও জিততে পারেনি (৩টি ড্র ও ৩টি হার)।
বিশ্বকাপের এই লজ্জাজনক রেকর্ডগুলো প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চের চাপ সামলে নিজেদের মেলে ধরা কতটা কঠিন এবং সামান্যতম প্রস্তুতির অভাব কীভাবে একটি দেশের ফুটবল ইতিহাসকে আজীবনের জন্য কলঙ্কিত করতে পারে।