রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর বর্বরোচিত হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। মাত্র এক দিনেই মামলাটির ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত করেছেন আদালত।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন, ২০২৬) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে এই সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। বুধবার (৩ জুন) ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এক দিনেই জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন
মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনই আজ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ভিকটিমের বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লার জবানবন্দির মাধ্যমে সকালে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
পর্যায়ক্রমে আদালতে জবানবন্দি দেন:
-
ভিকটিমের মা পারভীন আক্তার ও বড় বোন রাইসা আক্তার।
-
ফুপু মাহমুদা আক্তার, ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন ও চাচা মিজানুর রহমান লিটন।
-
বাড়ির বাসিন্দা মনির হোসেন, শেখ আবু সামা এবং প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু।
-
কনস্টেবল রোমা আক্তার ও কনস্টেবল শরীফ মিয়া।
-
সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী এসআই ইকবাল হোসেন এবং ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. নাসাদ জাবিন।
-
আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদ।
-
এসআই রাশেদুল ইসলাম এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান।
সাক্ষ্যগ্রহণকালে রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামি পক্ষের আইনজীবী মুসা কলিমউল্লাহ সাক্ষীদের জেরা করেন। এর আগে কড়া নিরাপত্তায় মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
হৃদয়বিদারক সেই হত্যাকাণ্ড
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, শিশু রামিসা আক্তার পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজেদের রুমে ডেকে নেয়। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তার মা। একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান তিনি।
অনেক ডাকাডাকির পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং ভেতরের একটি বড় বালতিতে তার কাটা মাথা দেখতে পান তারা। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। এরপর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে মূল আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
মাত্র ১৫ দিনেই বিচার প্রক্রিয়ার শেষ প্রান্তে
গত ১৯ মে হত্যাকাণ্ডটি ঘটার পর বিচারিক প্রক্রিয়া অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে এগিয়েছে:
-
২০ মে: রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। একই দিনে প্রধান আসামি সোহেল রানা (৩০) আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে (২৬) কারাগারে পাঠানো হয়।
-
২৪ মে: ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায় তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান। একই দিনে ট্রাইব্যুনাল চার্জশিটটি আমলে নেন।
-
১ জুন: আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
-
২ জুন: মাত্র এক দিনেই মামলার ১৬ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়।
আজ ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পর মামলাটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায়ের দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবি ও ভিকটিমের পরিবার।