Home » ঋণের শৃঙ্খলে বন্দি বাংলাদেশের অর্থনীতি

ঋণের শৃঙ্খলে বন্দি বাংলাদেশের অর্থনীতি

মেগা প্রকল্পের আড়ালে কল্পনাতীত লুটপাট

0 comments 1.6K views
A+A-
Reset

বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে উন্নয়নের এক জাঁকজমকপূর্ণ বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বড় বড় মেগা প্রকল্প। কিন্তু সাম্প্রতিক সরকারি শ্বেতপত্র, গবেষণা সংস্থা ও তদন্ত প্রতিবেদনে যে প্রামাণ্য চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে ব্যয় হওয়া মোট অর্থের প্রায় ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ—যা অঙ্কের হিসাবে প্রায় পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা—দুর্নীতি, ঘুষ ও কৃত্রিমভাবে খরচ বাড়িয়ে লুটপাট করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশ থেকে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা) বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট ও অপচয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে, যার ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে এক ঐতিহাসিক রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। একই সাথে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৯ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা, যার সুদ ও কিস্তি মেটাতে গিয়ে বর্তমান অর্থনীতি আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি।

​উন্নয়নের নামে শেখ হাসিনা শাসিত আওয়ামী লীগ সরকারের এই পদ্ধতিগত লুণ্ঠন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে দেশের কয়েকটি বড় মেগা প্রকল্পে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খরচের অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়া হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়বহুল ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ প্রকল্প। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ও বৈশ্বিক জ্বালানি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘রসাটম’-এর একই প্রযুক্তি (VVER) ও সমপরিমাণ ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিবেশী দেশ ভারত কিংবা চীন অনেক কম খরচে নির্মাণ করেছে। ভারতের তামিলনাড়ুর ‘কুদনকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’-এর ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের নির্মাণ খরচ ছিল রূপপুরের প্রায় অর্ধেক—প্রায় ৬.২৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা)।

গবেষকদের তুলনামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, রূপপুরে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে, তা ভারতের কুদনকুলামের চেয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। এই অতিরিক্ত খরচের পেছনে রয়েছে যন্ত্রাংশ ও আবাসন কেনাকাটায় আকাশচুম্বী দুর্নীতি এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, যা প্রকল্পটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ফাঁদে পরিণত করেছে।

​একই ধরনের লাগামহীন লুটপাট চালানো হয়েছে ৩৯,২৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প’-এ। কোনো প্রকার উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই চড়া মূল্যে চীনের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে এই কাজ দেওয়া হয়। এরপর দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে এবং সাধারণ রেললাইনের তুলনায় কিলোমিটার প্রতি নির্মাণ ব্যয় কয়েক গুণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে জনগণের ট্যাক্সের টাকা লুট করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ১০,৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘কর্ণফুলী টানেল’ ছিল কোনো বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) ছাড়া কেবল রাজনৈতিক চমক দেখানোর জন্য নেওয়া একটি আত্মঘাতী প্রকল্প। বর্তমানে এই টানেল দিয়ে অপর্যাপ্ত গাড়ি চলাচলের কারণে টোল থেকে যে রাজস্ব আয় হয়, তা এর দৈনিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচের চেয়েও কম। ফলে এটি এখন রাষ্ট্রের জন্য একটি বিশাল লোকসানি ‘শ্বেত হাতি’ প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।

​এই মেগা প্রকল্পগুলোর বিপুল ঋণের বোঝা, কৃত্রিম ব্যয়বৃদ্ধি এবং অর্থ পাচারের সামগ্রিক খেসারত আজ দিতে হচ্ছে দেশের আপামর সাধারণ মানুষকে। দেশের কৃষক, শ্রমিক, রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং সাধারণ চাকুরিজীবীরা দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যে ট্যাক্স দিচ্ছেন, তা দিয়ে সচল রাখা হচ্ছে অর্থনীতির চাকা। অথচ সেই কষ্টের টাকা যখন এভাবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের পকেটে চলে যায় এবং ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে দেশজুড়ে তীব্র মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়, তখন দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম হওয়া স্বাভাবিক।

এই চরম বৈষম্যমূলক ও লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থার বিপরীতে দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে আজ একটি মৌলিক ও তীব্র প্রশ্ন বিবেকের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ায়—

​”দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের অপরাধটা আসলে কী ছিল?”

You may also like

Leave a Comment

সম্পাদক: দাঊদ আরমান

অফিস: গুলজার টাওয়ার (২য় তলা), চট্টেশ্বরী রোড, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

ইমেইল: khobor24ghontabangla@gmail.com

Latest Articles

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
©
খবর ২৪ ঘণ্টা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত (২০২৪ – ২০২৬)
Registration No.: 391/2025-26

Developed BY  Netfie.com