বহুল আলোচিত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টাইনের যৌন নির্যাতন ও পাচার সংক্রান্ত ফাইল প্রকাশে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের চরম অব্যবস্থাপনা এবং গাফিলতির বিষয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে হাউস কমিটির মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি। দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষিত এই রুদ্ধদ্বার শুনানিতে আইন প্রণেতারা বন্ডিকে নিবিড় জেরার মুখোমুখি করছেন, যা এই মামলাটিকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে।
পূর্বে এই তদন্তের মুখোমুখি হয়ে পাম বন্ডি বেশ আক্রমণাত্মক ও চ্যালেঞ্জিং মনোভাব দেখালেও, এবার জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের (বিচার বিভাগ) প্রধানের পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর শুক্রবারের এই রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে তাঁর অবস্থান কেমন হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
তদন্তের মূল লক্ষ্য ও আইনপ্রণেতাদের বক্তব্য
হাউস ওভারসাইট কমিটির এই ‘ট্রান্সক্রাইবড ইন্টারভিউ’ বা অনুলিপি সাক্ষাৎকারের মূল লক্ষ্য হলো ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে এপস্টাইনের স্পর্শকাতর ফাইলগুলো পরিচালনা করেছিল, তা খতিয়ে দেখা। এর পাশাপাশি এপস্টাইনের প্রাক্তন প্রেমিকা ও সহযোগী গিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের কারাদণ্ডের বিষয়টি নিয়েও তথ্য খোঁজা হচ্ছে, যাকে গত আগস্টে টেক্সাসের একটি প্রিজন ক্যাম্পে স্থানান্তর করে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট।
হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য (অ্যারিজোনা) রিপ্রেজেন্টেটিভ ইয়াসামিন আনসারি বলেন:
“বন্ডি যদি নিজে চান, তবে তিনি এই রহস্যের অনেকগুলো নিখোঁজ সূত্র পরিষ্কার করতে পারেন। এখন মূল প্রশ্ন হলো, তিনি আসলেই স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ইচ্ছুক কি না।”
তদন্তকারীরা মূলত জানার চেষ্টা করছেন যে, এপস্টাইনের সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষেত্রে প্রসিকিউটররা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কংগ্রেসের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ফাইল প্রকাশে কেন বিলম্ব করা হলো এবং এই প্রক্রিয়ার পেছনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল কি না।
স্বার্থের সংঘাত ও নতুন বিতর্ক
সম্প্রতি থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসা নেওয়ার কথা প্রকাশ করা পাম বন্ডি গত এপ্রিলে পদ হারানোর পরও ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলয়ে রয়ে গেছেন। চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প তাঁকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিষয়ক একটি হোয়াইট হাউস প্যানেলে নিযুক্ত করেছেন।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে যখন দেখা গেছে, শুক্রবারের এই শুনানিতে বন্ডির আইনজীবী হিসেবে তাঁর সাথে উপস্থিত আছেন জাস্টিস ডিপার্টমেন্টেরই সিভিল রাইটস ডিভিশনের প্রধান হারমিত ধিলোঁসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ডেমোক্র্যাটরা এই বিষয়টিকে স্পষ্ট ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তবে বিচার বিভাগের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, কর্মকর্তারা কেবল ফাইল প্রকাশের আইনি প্রক্রিয়াটি আইনপ্রণেতাদের বুঝিয়ে বলতেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এপস্টাইন সাগায় বন্ডির ভূমিকা ও ভিডিও ধারণের দাবি
পাম বন্ডি প্রথম থেকেই এপস্টাইন ফাইল বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন। শুরুতে তিনি ফাইলগুলো সম্পূর্ণ প্রকাশের আশ্বাস দিয়ে আশাবাদ জাগালেও পরে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন, যার ফলে কংগ্রেস বাধ্য হয়ে একটি নতুন আইন পাস করে ফাইল প্রকাশের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে যখন ফাইলগুলো প্রকাশ করা হয়, তখন তা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে আসে এবং সেখানে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন বন্ডি।
গত মার্চ মাসে বন্ডিকে কমিটির পক্ষ থেকে সমন (Subpoena) পাঠানো হলেও তিনি একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে তা এড়ানোর চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ডেমোক্র্যাটরা তাঁর বিরুদ্ধে ‘কমিটি অবমাননা’র প্রস্তাব আনার তোড়জোড় শুরু করলে, তিনি শপথপূর্বক জবানবন্দির (Deposition) পরিবর্তে একটি লিখিত সাক্ষাৎকার দিতে সম্মত হন।
ডেমোক্র্যাটরা এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে বলেছেন, এর ফলে বন্ডি অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জেমস কোমারকে চিঠি দিয়ে এই সাক্ষাৎকারটি ভিডিও রেকর্ড করার দাবি জানিয়ে লিখেছেন:
“মিস বন্ডির বক্তব্যের ভিডিও ধারণ এবং তা প্রকাশ না করা হলে, তা আমেরিকার জনগণ এবং এপস্টাইনের অপরাধের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের প্রতি চরম অন্যায় হবে।”
কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার অবশ্য জানিয়েছেন, বন্ডিকে তদন্তে সহযোগিতা করতে উৎসাহিত করতেই জবানবন্দির বদলে অনুলিপি সাক্ষাৎকারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কংগ্রেসের কাছে মিথ্যা বললে বন্ডি ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে পারেন এবং খুব শীঘ্রই এই সাক্ষাৎকারের অনুলিপি জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে।