লেবাননের পূর্বাঞ্চলীয় বেকা উপত্যকার মাশঘারা গ্রামে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বিমানবাহিনী। এতে অন্তত ১২ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এই রক্তক্ষয়ী হামলার ফলে গত মাসে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, সোমবার গভীর রাতে মাশঘারা গ্রামে এই হামলা চালানো হয়।
১০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা বেকা উপত্যকা এবং দক্ষিণ লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর ১০০টিরও বেশি অবকাঠামো এবং “সন্ত্রাসী” আস্তানায় একযোগে এই শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই এই অভিযান চালানো হয়, যা মূলত মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
মাশঘারা থেকে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিক জেইনা খোদর জানিয়েছেন, মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে অন্তত ১০টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, “এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে নিখোঁজ থাকায় চূড়ান্ত নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। উদ্ধারকারীরা মাটি কাটার যন্ত্র (এক্সকাভেটর) দিয়ে এখনও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।”
হিজবুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, এই তীব্র হামলা মূলত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টির কৌশল। দক্ষিণ লেবানন দখল করে রাখা ইসরাইলি সেনা এবং উত্তর ইসরাইলের সামরিক অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহ অনবরত বিস্ফোরক ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। ইসরাইলি বাহিনী মূলত এই ড্রোন হামলা বন্ধ করতে এবং ওই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতেই হিজবুল্লাহকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।
দক্ষিণ লেবাননে ভারী কামানের গোলাবর্ষণ ও উচ্ছেদ নোটিশ
মাশঘারা ছাড়াও দক্ষিণ লেবাননের আর্নুন, ইয়োহমোর আল-শাকিফ, জাওতার আল-শারকিয়াহ এবং মায়ফাদুন শহরে ব্যাপক কামানের গোলাবর্ষণ করেছে ইসরাইলি বাহিনী। গোলার আঘাত প্রাচীন বুফোর্ট দুর্গের কাছাকাছি এলাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। ভোর থেকেই মায়ফাদুনসহ টায়ার জেলার শাহর ও স্রিফা শহরে অনবরত শেলিং করা হচ্ছে। এছাড়া কাওথারিয়াত আল-রুজ, সারাফিনা, কাফর এবং মাজদাল সেলেম শহরেও বিমান হামলার খবর মিলেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দক্ষিণ লেবাননের অন্যতম বড় শহর নাবাতিয়াহ এর বাসিন্দাদের অবিলম্বে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য জোরপূর্বক উচ্ছেদ নোটিশ জারি করেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদরাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (X) পোস্ট করে বলেন, “নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে ঘরবাড়ি ছেড়ে জাহরানি নদীর উত্তরে চলে যান। যারা হিজবুল্লাহর সদস্য, স্থাপনা বা সামরিক সরঞ্জামের কাছাকাছি থাকবেন, তারা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন।”
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের জের
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হওয়ার পর, ২ মার্চ থেকে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে লেবানন। তেহরানপন্থী গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ জানায়, খামেনেই হত্যার প্রতিশোধ এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরাইল কর্তৃক প্রতিদিন লঙ্ঘনের জবাবেই তারা ইসরাইলে পাল্টা হামলা শুরু করে।
লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে ইসরাইলি হামলায় ৩,১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ৯,৬০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এছাড়া বাস্তুচ্যুত বা ঘরহীন হয়ে পড়েছেন অন্তত ১০ লাখ মানুষ।