বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়া মানেই যেন উন্মাদনা, বিনিদ্র রজনী আর তর্কের এক নতুন জোয়ার, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ফুটবল বিশ্বের চিরবৈরী দুই পরাশক্তি—ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বমঞ্চের এই আসরকে ঘিরে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া মেতে ওঠে এক অভূতপূর্ব ফুটবল উৎসবে। পাড়ার মোড়ের চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে ফেসবুকের কমেন্ট বক্স, সবখানেই এই দুই দলের সমর্থকেরা নিজেদের দলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মেতে ওঠেন নানামুখী পরিসংখ্যান আর ঐতিহাসিক তথ্যের ঝাঁপি খুলে। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই দুই দলের লড়াই শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলার ঘরে ঘরে তা রূপ নেয় এক সামাজিক দ্বৈরথে। একদিকে হলুদ-সবুজের সাম্বা ম্যাজিক, অন্যদিকে আকাশী-সাদার পাসিং ফুটবলের শৈল্পিক জাদু—এই দুই মেরুর সমর্থকদের চিরন্তন লড়াইকে বাঁচিয়ে রাখে যুগ যুগ ধরে জমে ওঠা ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান।
ফিফা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ৯৬ বছরের ইতিহাসের খাতা ওল্টালে দেখা যায়, সামগ্রিক পরিসংখ্যানে কিছুটা হলেও এগিয়ে রয়েছে ‘সেলেসাও’ খ্যাত ব্রাজিল। ১৯৩০ সালে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের প্রথম আসর থেকে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়া প্রতিটি আসরে অংশ নেওয়া পৃথিবীর একমাত্র দল ব্রাজিল। কোনো বিশ্বকাপ থেকেই বাদ না পড়া এই দলটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২২টি বিশ্বকাপে মাঠে নেমেছে। অন্যদিকে, ‘আলবিসেলেস্তে’ আর্জেন্টিনা ১৯৩০ সালের প্রথম আসরে অংশ নিলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে কয়েকটি আসরে অংশ নেয়নি বা কোয়ালিফাই করতে পারেনি, যার ফলে তারা এ পর্যন্ত মোট ১৯টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। শিরোপার রাজকীয় লড়াইয়ে ৫ বার (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২) সোনালী ট্রফি জিতে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ মুকুট নিজেদের করে রেখেছে পেলের দেশ ব্রাজিল; বিপরীতে ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির ‘আলবিসেলেস্তে’ আর্জেন্টিনা ৩ বার (১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২) বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
তবে রানার্স-আপ হওয়ার দিক থেকে আবার আর্জেন্টিনাই এগিয়ে; তারা ৩ বার (১৯৩০, ১৯৯০ ও ২০১৪) ফাইনালে উঠেও রানার্স-আপ ট্রফি নিয়ে মাঠ ছেড়েছে, যেখানে ব্রাজিল রানার্স-আপ হয়েছে মাত্র ২ বার (১৯৫০ ও ১৯৯৮)।
মাঠের পারফরম্যান্স এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের এক রোমাঞ্চকর চিত্র ফুটে ওঠে। বিশ্বকাপে মোট ম্যাচ খেলার দিক থেকে ব্রাজিল এ পর্যন্ত ১১৪টি ম্যাচ খেলে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৭৬টি ম্যাচে জয়লাভ করেছে। এর বিপরীতে আর্জেন্টিনা বিশ্বমঞ্চে মোট ৮৮টি ম্যাচ খেলে জয় তুলে নিতে পেরেছে ৪৯টি ম্যাচে। গোলের মহোৎসবেও ব্রাজিল ভক্তদের মুখে চওড়া হাসি ফুটে ওঠে, কারণ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মোট গোল সংখ্যা ২৪০টি, যার বিপরীতে তারা গোল হজম করেছে বা খেয়েছে ১০৮টি। অন্যদিকে, আকাশী-সাদা শিবিরের আর্জেন্টিনা বিশ্বমঞ্চে মোট গোল করেছে ১৫২টি এবং তাদের ডিফেন্স ভেদ করে প্রতিপক্ষ বল জড়িয়েছে ১০১ বার।
নকআউট পর্ব বা মুখোমুখি লড়াইয়ের চাপ সামলানোর দক্ষতায় দুই দলই বিশ্বসেরা হলেও, বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা মোট ৪ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাজিল জিতেছে ২ বার (১৯৭৪ ও ১৯৮২ সালে), আর্জেন্টিনা জিতেছে ১ বার (১৯৯০ সালে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার সেই বিখ্যাত গোলে) এবং বাকি ১টি ম্যাচ (১৯৭৮ সালে) গোলশূন্য ড্র হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনার ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয় দলটির সমর্থকদের চায়ের টেবিলে তর্কের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ও অত্যন্ত শক্তিশালী এক রসদ জুগিয়েছে। কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির ট্রফি উঁচিয়ে ধরার দৃশ্যটি আর্জেন্টিনা ভক্তদের দীর্ঘ ৩৬ বছরের আক্ষেপ ঘোচানোর পাশাপাশি ব্রাজিল সমর্থকদের ‘পাঁচ তারকা’র অহংকারের মুখে এক নতুন চ্যলেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। তবে ব্রাজিল সমর্থকরাও হাত গুটিয়ে বসে নেই, তাদের দাবি—যতক্ষণ না অন্য কেউ পাঁচবার বিশ্বসেরা হতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফুটবল রাজত্বের আসল রাজা ব্রাজিলই।
পরিসংখ্যানে কেউ ম্যাচে এগিয়ে, কেউ বা ট্রফিতে; কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক তথ্যের চেয়েও বড় সত্য হলো এই দুই দলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আর এই দুই ফুটবল পরাশক্তির এমন চিরন্তন ও হাড্ডাহাড্ডি পরিসংখ্যানই প্রতি ৪ বছর পর পর বাংলাদেশের সাধারণ দর্শকদের ফুটবল আবেগকে এক অনন্য, উৎসবমুখর এবং আনন্দময় রূপ দেয়, যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে মেলা ভার।