ইউরোপের হৃদপিণ্ডে অবস্থিত এক শিল্পময় দেশ— অস্ট্রিয়া। যেখানে আল্পস পাহাড়ের চূড়ায় মেঘেরা বিশ্রাম নেয় এবং ভিয়েনার অভিজাত কফি হাউসের গন্ধে মিশে থাকে শত বছরের ইতিহাস। মোৎসার্ট আর বিটোভেনের সুরের ঝংকারে এই দেশ কেবল সংগীতেরই রাজধানী নয়, বরং আভিজাত্য আর স্থাপত্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। অনেকে একে জার্মানির প্রতিবেশী হিসেবে চিনলেও, অস্ট্রিয়ার নিজস্ব স্বকীয়তা আর অদ্ভুত সব ইতিহাস আপনাকে রীতিমতো চমকে দেবে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক রাজকীয় অস্ট্রিয়ার ৫টি চমকপ্রদ ও অজানা তথ্য:
১. ক্রোয়েসাঁ (Croissant) আসলে ফরাসি নয়!
আমরা সবাই ভাবি ‘ক্রোয়েসাঁ’ মানেই ফ্রান্সের খাবার। কিন্তু আসল সত্য হলো, এর জন্ম হয়েছিল অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায়। এর আদি নাম ছিল ‘কিপফার্ল’ (Kipferl)। ১৬৮৩ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ভিয়েনার জয়ের স্মারক হিসেবে এই বিশেষ রুটি তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে অস্ট্রিয়ার রাজকন্যা মেরি আঁতোয়ানেত যখন ফ্রান্সের রানি হয়ে যান, তখন তিনি এই খাবারটি ফ্রান্সে জনপ্রিয় করেন। অর্থাৎ, ফরাসিদের এই প্রিয় নাস্তাটি আসলে অস্ট্রিয়ানদের উপহার!
২. বিশ্বের প্রাচীনতম চিড়িয়াখানা
আপনি কি জানেন পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো চিড়িয়াখানাটি কোথায়? এটি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অবস্থিত। নাম ‘টিয়ারগার্টেন শোনব্রুন’ (Tiergarten Schönbrunn)। ১৭৫২ সালে রাজকীয় পরিবারের জন্য এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আজও এটি সগৌরবে চালু আছে এবং একে বিশ্বের অন্যতম সেরা চিড়িয়াখানা হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে প্রাচীন রাজকীয় স্থাপত্য আর আধুনিক পশুপালনের এক দারুণ মিশেল দেখা যায়।
৩. প্রথম ‘পোস্টকার্ড’ চালুর দেশ
আজকের ডিজিটাল যুগে আমরা হয়তো পোস্টকার্ড পাঠাই না, কিন্তু একসময় এটি ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ১৮৬৯ সালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যই বিশ্বে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে পোস্টকার্ড বা ‘করেসপন্ডেন্স কার্ড’ চালু করে। এর আগে চিঠি পাঠাতে খাম লাগত, যা ছিল ব্যয়বহুল। অস্ট্রিয়ানদের এই সহজ উদ্ভাবনটি খুব দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।

সালসবুর্গের ঐতিহ্যবাহী ট্রাশটেনওয়োচ উৎসব
৪. রক্তাক্ত ইতিহাস ও পতাকার রহস্য
অস্ট্রিয়ার লাল-সাদা-লাল পতাকাকে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন পতাকা বলা হয়। এর পেছনের গল্পটি বেশ নাটকীয়। কিংবদন্তি অনুযায়ী, ১১৯১ সালে ‘সিজ অফ একর’ যুদ্ধের সময় অস্ট্রিয়ার ডিউক লিওপোল্ড (V) এত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন যে তার সাদা পোশাকটি শত্রুর রক্তে পুরোপুরি লাল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন তিনি তার কোমরবন্ধ বা বেল্টটি খুললেন, দেখা গেল নিচের অংশটি একদম সাদা রয়ে গেছে। এই ‘লাল-সাদা-লাল’ দৃশ্যটিই পরে দেশটির জাতীয় পতাকার অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
৫. সেলাই মেশিনের জন্মদাতা
আমরা কাপড় সেলাইয়ের জন্য যে মেশিনের ওপর নির্ভর করি, তার প্রথম কার্যকর নকশাটি তৈরি করেছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান দর্জি— জোসেফ মাডারস্পার্গার (Josef Madersperger)। ১৮১৪ সালে ভিয়েনায় তিনি প্রথম কাজ করার মতো একটি সেলাই মেশিন আবিষ্কার করেন। যদিও তিনি এটি থেকে খুব একটা অর্থ উপার্জন করতে পারেননি, কিন্তু তার এই উদ্ভাবনটিই আধুনিক পোশাক শিল্পের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
অস্ট্রিয়ার এই রাজকীয় ইতিহাস আর উদ্ভাবনী গল্পগুলো কি আপনার মনে দোলা দিল? তুষারাবৃত আল্পস আর ভিয়েনার অপেরা হাউসের এই দেশটিতে একবার ঘুরে আসা কিন্তু মন্দ হয় না!