ইউরোপ আর এশিয়ার মোহনায়, ককেশাস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এক বিস্ময়কর দেশ— আজারবাইজান। একে বলা হয় ‘ল্যান্ড অফ ফায়ার’ বা ‘আগুনের দেশ’। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঝলমলে রাজধানী বাকু থেকে শুরু করে আদিম কাদা আগ্নেয়গিরি পর্যন্ত, এই দেশটি যেন এক জীবন্ত রূপকথা। আজারবাইজানের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এমন সব অদ্ভুত রহস্য, যা আপনার কল্পনাকেও হার মানাবে। আগুনের শিখা যেখানে মাটির বুক চিরে বেরিয়ে আসে, সেখানে রোমাঞ্চের অভাব হবে না এটাই স্বাভাবিক!
চলুন জেনে নেওয়া যাক রহস্যময় আজারবাইজানের ৫টি চমকপ্রদ তথ্য:
১. চিরকাল জ্বলতে থাকা পাহাড়: ‘ইয়ানার দাগ’
আজারবাইজানের একটি পাহাড় আছে যা বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টা জ্বলতে থাকে। এর নাম ‘ইয়ানার দাগ’ (Yanar Dag)। বৃষ্টির ঝাপটা কিংবা বরফের পতন—আসলে মাটির নিচ থেকে অবিরাম প্রাকৃতিক গ্যাস নির্গত হওয়ার কারণেই এই পাহাড়টি কয়েক শতাব্দী ধরে এভাবে জ্বলছে। প্রাচীনকালে পর্যটকরা দূর থেকে এই শিখা দেখে অবাক হতেন, আর এই আগুনের কারণেই দেশটির নাম হয়েছে ‘আগুনের দেশ’।
২. কাদা আগ্নেয়গিরির স্বর্গরাজ্য
আপনি কি জানেন, পৃথিবীতে যতগুলো কাদা আগ্নেয়গিরি (Mud Volcanoes) আছে, তার প্রায় অর্ধেকই অবস্থিত আজারবাইজানে? পুরো বিশ্বে প্রায় ৮০০টি কাদা আগ্নেয়গিরির মধ্যে প্রায় ৪০০টিই এই দেশে। তবে ভয়ের কিছু নেই, এগুলো থেকে উত্তপ্ত লাভা বের হয় না; বরং ঠান্ডা কাদা বেরিয়ে আসে। পর্যটকরা এই কাদা দিয়ে রূপচর্চা করতেও সেখানে ভিড় জমান, কারণ এখানকার কাদায় প্রচুর মিনারেল থাকে।

৩. সুস্থতার জন্য তেলের স্নান!
সাধারণত আমরা সাবান বা পানি দিয়ে গোসল করি, কিন্তু আজারবাইজানের নাফতালান (Naftalan) শহরে মানুষ যায় অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) ট্যাংকে গোসল করতে! শুনে অবাক লাগলেও, এই বিশেষ তেলে ঔষধি গুণ আছে বলে মানা হয়। বাতের ব্যথা, চর্মরোগ বা স্নায়বিক সমস্যা দূর করতে এই ‘তেল-স্নান’ সেখানে দারুণ জনপ্রিয়। কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই এই চিকিৎসার কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়।
৪. চায়ের সাথে জ্যামের অদ্ভুত বন্ধুত্ব
আজারবাইজানিরা চা পান করতে খুব ভালোবাসে, কিন্তু তাদের চা পানের ভঙ্গিটি একদম আলাদা। তারা চা পান করে নাশপাতির মতো আকৃতির ছোট ছোট গ্লাসে, যাকে বলা হয় ‘আরমুদু’ (Armudu)। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, তারা চায়ের সাথে চিনির বদলে অনেক সময় বিভিন্ন ফলের জ্যাম (যেমন: চেরি বা ডুমুরের জ্যাম) মুখে নিয়ে চা পান করে। আর সেখানে অতিথিকে চা না দেওয়া বা চায়ের অফার ফিরিয়ে দেওয়াকে খুব বড় অভদ্রতা হিসেবে দেখা হয়।
৫. প্রথম মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র
ইতিহাসের পাতায় আজারবাইজানের এক অনন্য গৌরব আছে। ১৯১৮ সালে যখন তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তখন এটি ছিল মুসলিম বিশ্বের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। শুধু তাই নয়, আমেরিকার অনেক আগে ১৯১৯ সালেই আজারবাইজান নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করেছিল। আধুনিক মূল্যবোধ আর প্রাচীন ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধন দেশটিকে বিশ্বের কাছে এক অনন্য উদাহরণ করে তুলেছে।
আজারবাইজানের এই জ্বলন্ত পাহাড় আর কাদা আগ্নেয়গিরি কি আপনার মনে বিস্ময় জাগাতে পেরেছে? বাকুর সেই ‘ফ্লেম টাওয়ার্স’ (Flame Towers) এর মায়াবী আলোয় একবার ঘুরে আসতে কার না মন চায়!