মরুভূমির তপ্ত বালু আর পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির যেখানে মিতালী, সেখানেই জেগে আছে এক ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র— বাহরাইন। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও এই দেশটির আভিজাত্য আর ইতিহাস বিশাল। একসময় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মুক্তোর জোগানদাতা এই দেশটিকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য পৌরাণিক কাহিনী। আধুনিক গগনচুম্বী অট্টালিকা আর প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন এই বাহরাইন, যেখানে প্রতিটি সূর্যাস্ত যেন এক নতুন গল্পের সূচনা করে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক রহস্যময় বাহরাইন সম্পর্কে ৫টি চমকপ্রদ তথ্য:
১. ‘দুই সমুদ্রের’ এক অদ্ভুত মিলন
‘বাহরাইন’ শব্দটির উৎপত্তি আরবি শব্দ ‘বাহর’ (সমুদ্র) থেকে, যার শাব্দিক অর্থ হলো ‘দুই সমুদ্র’। কিন্তু কেন এই নাম? কারণ এই দ্বীপটির চারদিকে যেমন সমুদ্রের নোনা পানি, তেমনি সমুদ্রতলের কিছু জায়গায় আশ্চর্যজনকভাবে মিষ্টি পানির ঝরনা বা উৎস পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে ডুবুরিরা সমুদ্রের তলদেশ থেকে এই মিষ্টি পানি সংগ্রহ করত। নোনা পানির বুকে মিষ্টি পানির এই অবস্থানই দেশটিকে এই অনন্য নাম দিয়েছে।
২. ৪৫০ বছরের রহস্য: ‘জীবনের বৃক্ষ’
বাহরাইনের তপ্ত মরুভূমির ঠিক মাঝখানে কোনো এক অলৌকিক ক্ষমতায় টিকে আছে একটি বিশাল মেসকুইট গাছ, যাকে বলা হয় ‘শাজরাত-আল-হায়াত’ (Tree of Life)। প্রায় ৪৫০ বছর বয়সী এই গাছটির আশেপাশে মাইলের পর মাইল কোনো পানির উৎস নেই, নেই কোনো অন্য উদ্ভিদ। মরুভূমির প্রচণ্ড গরমেও এটি কীভাবে চিরসবুজ হয়ে বেঁচে আছে, তা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক অমীমাংসিত রহস্য। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এটিই হলো বাইবেলে বর্ণিত সেই ‘ইডেন উদ্যান’-এর শেষ চিহ্ন।
৩. বিশ্বের প্রাচীনতম ‘কবরস্থান’
বাহরাইন একসময় প্রাচীন দিলমুন সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এই দ্বীপটিতে হাজার হাজার মাটির স্তূপ বা পাহাড় চোখে পড়ে, যা আসলে কোনো সাধারণ পাহাড় নয়। এগুলো হলো কয়েক হাজার বছরের পুরনো সমাধিস্তূপ বা ‘ব্রায়াল মাউন্টস’। বলা হয়, এককালে বাহরাইন ছিল বিশ্বের বৃহত্তম প্রাগৈতিহাসিক কবরস্থান। এই সমাধিস্তূপগুলো এখন ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত।
৪. তেলের আগে যেখানে রাজত্ব করত ‘মুক্তো’
১৯৩২ সালে পারস্য উপসাগরে প্রথম তেল আবিষ্কৃত হয়েছিল এই বাহরাইনেই। কিন্তু তেলের খনি পাওয়ার আগে বাহরাইনের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল মুক্তো চাষ। এখানকার সমুদ্রের মুক্তোকে বিশ্বের সেরা এবং বিশুদ্ধতম মুক্তো হিসেবে গণ্য করা হতো। আজও বাহরাইন তার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এবং সেখানে কৃত্রিম বা কালচারড মুক্তো বিক্রি করা আইনত নিষিদ্ধ, যাতে প্রাকৃতিক মুক্তোর মান ক্ষুণ্ণ না হয়।

বিশ্বের সেরা এবং বিশুদ্ধতম—বাহরাইনের মুক্তো
৫. প্রথম ফর্মুলা ওয়ান এবং আধুনিকতা
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইনই প্রথম দেশ যারা ২০০৪ সালে ফর্মুলা ওয়ান (F1) গ্র্যান্ড পিক্স আয়োজন করেছিল। মরুভূমির বুক চিরে তৈরি করা ‘বাহরাইন ইন্টারন্যাশনাল সার্কিট’ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা রেসিং ট্র্যাক। এছাড়া বাহরাইন হলো সেই বিরল দেশগুলোর একটি, যেখানকার রাজধানী ‘মানামা’র আকাশছোঁয়া ভবনের নিচেই খুঁজে পাবেন হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী বাজার বা ‘সুক’।
বাহরাইনের সেই রহস্যময় ‘জীবনের বৃক্ষ’ কি আপনার মনে বিস্ময় জাগাতে পেরেছে? মরুভূমির নিস্তব্ধতা আর নীল সমুদ্রের এই মেলবন্ধন কি আপনাকে একবার অন্তত বাহরাইন ঘুরে আসতে প্রলুব্ধ করছে?