পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকের প্রতিটি মুহূর্ত হিরণ্ময়। এই সময়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহিমান্বিত ‘লাইলাতুল কদর’, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশে কদর তালাশ করার ক্ষেত্রে একটি মারাত্মক ভ্রান্ত ধারণা জেঁকে বসেছে। আমরা কদরকে কেবল একটি নির্দিষ্ট রাতের (২৭শে রমজান) গণ্ডিতে আটকে ফেলেছি, যা আমাদের অজান্তেই বছরের পর বছর এক বিশাল নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করছে।
১. সুন্নাহর নির্দেশনা বনাম আমাদের সংস্কৃতি
রাসুলুল্লাহ (সা.) কদরের রাত তালাশ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন:
“তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো।” (সহীহ বুখারী: ২০১৭)
এখানে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯—এই পাঁচটি রাতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে চিত্রটি ভিন্ন। দেখা যায়, ২০ থেকে ২৬ রমজান পর্যন্ত মসজিদগুলোতে ভিড় কম থাকে, কিন্তু ২৭শে রমজান দিবাগত রাতে হঠাৎ মানুষের ঢল নামে। এই দিনটিকে আমরা অঘোষিতভাবে ‘লাইলাতুল কদর’ হিসেবে নিশ্চিত ধরে নেই। অথচ হাদিস অনুযায়ী, কদর ‘যেকোনো বেজোড় রাতেই’ হতে পারে। এমনকি অনেক আলেমের মতে, প্রতি বছর এটি পরিবর্তিত হতে পারে।
২. আমরা কী হারাচ্ছি?
যদি কোনো বছর কদর ২১, ২৩ বা ২৫তম রাতে হয়ে থাকে, আর আমরা যদি কেবল ২৭শে রমজান ইবাদত করি, তবে আমরা সেই ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের সওয়াব থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হলাম। এটি আমাদের জীবনের জন্য কত বড় অপূরণীয় ক্ষতি, তা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। কেবল একটি রাতের ওপর নির্ভর করে বাকি বেজোড় রাতগুলোকে অবহেলা করা মানে হলো ভাগ্যের সাথে বাজি ধরা।

৩. নবীজি (সা.) এর আমল ও আমাদের শিক্ষা
নবীজি (সা.) নিজে কি কেবল ২৭শে রমজান ইবাদত করতেন? কখনো না। বরং তিনি শেষ ১০ দিন পুরোটা ইতিকাফ করতেন এবং ইবাদতে চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন:
“যখন রমজানের শেষ দশ দিন আসত, তখন নবীজি (সা.) তাঁর কোমর শক্ত করে বাঁধতেন (অর্থাৎ সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন), সারা রাত জেগে থাকতেন এবং তাঁর পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন।” (সহীহ বুখারী: ২০২৪)
নবীজির এই সুন্নাহ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, কদর পাওয়ার একমাত্র পথ হলো পুরো দশ দিন অথবা অন্তত পাঁচটি বেজোড় রাত একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করা। কোনো একটি নির্দিষ্ট রাতের ওপর ভরসা করে বসে থাকা সুন্নাহসম্মত নয়।
৪. কেন আল্লাহ কদরকে গোপন রাখলেন?
আল্লাহ চাইলে কদরকে নির্দিষ্ট করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা গোপন রেখেছেন যাতে বান্দা পুরো দশটি রাত ইবাদতে মগ্ন থাকে। কেউ যদি কেবল এক রাত ইবাদত করে মনে করে সে কদর পেয়ে গেছে, তবে তার মধ্যে এক ধরণের আত্মতুষ্টি বা অলসতা চলে আসে। পক্ষান্তরে, পাঁচটি রাত তালাশ করলে বান্দার ইবাদতের পরিমাণ বাড়ে এবং আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়।
২৭শে রমজানের গুরুত্ব অবশ্যই আছে, কিন্তু একেই একমাত্র কদরের রাত মনে করা এবং বাকি রাতগুলোকে ইবাদতশূন্য রাখা একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমাদের উচিত প্রচলিত ঐতিহ্যের চেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আসুন, আমরা শেষ দশকের প্রতিটি বেজোড় রাতকে কদরের রাত মনে করে ইবাদত করি, যেন হাজার মাসের সেই অনন্য নেয়ামত আমাদের হাতছাড়া না হয়।