মানবজাতির হেদায়েত, সত্য ও ন্যায়ের পথ প্রদর্শনের জন্য পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে ১ লক্ষ ২৪ হাজারেরও বেশি নবী-রাসুল পাঠালেও, মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সর্বমোট ২৫ জন নবী ও রাসুলের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সুরা আন-আমের ৮৩ থেকে ৮৬ নম্বর আয়াতে একসাথেই ১৮ জন নবী ও রাসুলের নাম এসেছে এবং বাকিদের নাম কুরআনের অন্যান্য সুরায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বর্ণিত হয়েছে।
কুরআনে বর্ণিত সেই ২৫ জন নবী-রাসুল হলেন:
১. হযরত আদম (আ.) — মানবজাতির আদি পিতা এবং পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও নবী।
২. হযরত ইদ্রিস (আ.) — হযরত আদম (আ.)-এর পরবর্তী বংশধর, যাকে লেখার শিল্প এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান শেখানো হয়েছিল।
৩. হযরত নূহ (আ.) — আদি প্লাবনের নবী।
৪. হযরত হূদ (আ.) — আদ জাতির কাছে প্রেরিত নবী।
৫. হযরত ছালেহ (আ.) — সামূদ জাতির কাছে প্রেরিত নবী (যার মোজেজা ছিল অলৌকিক উটনী)।
৬. হযরত ইব্রাহিম (আ.) — ‘আবু আম্বিয়া’ বা নবীদের পিতা এবং মিল্লাতে ইসলামিয়ার জনক।
৭. হযরত লূত (আ.) — হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সমসাময়িক ও তাঁর ভাতিজা, যিনি সদোম অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন।
৮. হযরত ইসমাইল (আ.) — হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং মক্কা নগরী ও যমযম কূপের ইতিহাসের সাথে জড়িত নবী।
৯. হযরত ইসহাক (আ.) — হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দ্বিতীয় পুত্র, যার বংশধারা থেকে বনী ইসরাইলের নবীদের আগমন।
১০. হযরত ইয়াকুব (আ.) — হযরত ইসহাক (আ.)-এর পুত্র, যাঁর উপাধি ছিল ‘ইসরাইল’।
১১. হযরত ইউসুফ (আ.) — হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর প্রিয় পুত্র, যিনি মিশরের শাসনভার পেয়েছিলেন।
১২. হযরত আইয়ুব (আ.) — চরম ধৈর্য ও রোগমুক্তির অলৌকিক ইতিহাসের প্রতীক।
১৩. হযরত শুআইব (আ.) — মাদইয়ান জাতির কাছে প্রেরিত নবী, যিনি মাপে কম না দেওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন।
১৪. হযরত মুসা (আ.) — বনী ইসরাইলের মহান রাসুল, যাঁর ওপর তাওরাত কিতাব নাযিল হয়।
১৫. হযরত হারুন (আ.) — হযরত মুসা (আ.)-এর আপন বড় ভাই এবং তাঁর সহযোগী নবী।
১৬. হযরত যুল-কিফল (আ.) — বনী ইসরাইলের কাছে প্রেরিত একজন নবী।
১৭. হযরত দাউদ (আ.) — জালুতকে পরাস্তকারী বীর রাজা ও নবী, যাঁর ওপর যাবুর নাযিল হয়।
১৮. হযরত সুলাইমান (আ.) — হযরত দাউদ (আ.)-এর পুত্র, যিনি বাতাস ও জিন জাতিসহ পৃথিবীর একচ্ছত্র রাজত্ব পেয়েছিলেন।
১৯. হযরত ইলিয়াস (আ.) — বনী ইসরাইলের রাজা আখাবের আমলে বাল দেবতার মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে লড়াই করা নবী।
২০. হযরত আল-ইয়াসা (আ.) — হযরত ইলিয়াস (আ.)-এর উত্তরসূরি ও সহযোগী নবী।
২১. হযরত ইউনুস (আ.) — নিনোভে শহরের মানুষের কাছে প্রেরিত নবী, যিনি মাছের পেটে দীর্ঘ সময় জীবিত ছিলেন।
২২. হযরত জাকারিয়া (আ.) — বায়তুল মুকাদ্দাসের ইমাম এবং মরিয়ম (আ.)-এর তত্ত্বাবধায়ক।
২৩. হযরত ইয়াহইয়া (আ.) — হযরত জাকারিয়া (আ.)-এর পুত্র, যিনি অত্যন্ত অল্প বয়সে শহীদ হন।
২৪. হযরত ঈসা (আ.) — কুমারী মাতা মরিয়ম (আ.)-এর গর্ভে জন্ম নেওয়া অলৌকিক রাসুল, যাঁর ওপর ইনজিল নাযিল হয়।
২৫. হযরত মুহাম্মদ (স.) — সর্বযুগের ও সর্বকালের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল, যাঁর ওপর অবতীর্ণ হয় পবিত্র আল-কুরআন।
হযরত লূত (আ.), হযরত ইসমাইল (আ.) এবং হযরত ইসহাক (আ.)—এই তিন মহান নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবদ্দশাতেই তাঁর সমসাময়িক সময়ে পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিলেন। ঠিক একইভাবে হযরত মুসা (আ.) ও হযরত হারুন (আ.) সমসাময়িক ছিলেন এবং হযরত জাকারিয়া (আ.), হযরত ইয়াহইয়া (আ.) এবং হযরত ঈসা (আ.)-এর সময়কালও ছিল প্রায় কাছাকাছি বা সমসাময়িক।
কুরআনে এই ২৫ জন ছাড়াও ‘খিজির’, ‘ইউশা বিন নুন’ এবং ‘যুলকারনাইন’-এর মতো কিছু পুণ্যবান ও আল্লাহর প্রিয় বান্দার ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তবে তাঁরা নবী ছিলেন নাকি আল্লাহর অলি (নেককার বান্দা) ছিলেন—তা নিয়ে মতভেদ থাকায় তাঁদের এই ২৫ জনের মূল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
এই ২৫ জন মহান ব্যক্তিত্বের মধ্যে প্রধান চারজন রাসুলের ওপর মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে চারটি বড় ও প্রধান আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছিল, যার মধ্যে হযরত মুসা (আ.)-এর ওপর তাওরাত, হযরত দাউদ (আ.)-এর ওপর যাবুর, হযরত ঈসা (আ.)-এর ওপর ইনজিল এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল পবিত্র আল-কুরআন; এছাড়াও হযরত আদম (আ.), হযরত শীষ (আ.), হযরত ইদ্রিস (আ.) এবং হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ওপর বিভিন্ন সংখ্যায় আসমানী সহীফা বা ছোট পুস্তিকা নাযিল করা হয়েছিল।
ইসলামি ইতিহাস ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী এই নবী-রাসুলদের জীবনকাল ও বয়সের মধ্যেও ছিল বিশাল বৈচিত্র্য, যেখানে মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.) আনুমানিক ১০০০ বছর, ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘজীবী নবী হযরত নূহ (আ.) প্রায় ৯৫০ থেকে ১০৫০ বছর এবং হযরত ইদ্রিস (আ.) ৩৬৫ বছর বেঁচে ছিলেন।
অন্যান্য নবী-রাসুলদের জীবনকালের দিকে তাকালে দেখা যায়, হযরত ইব্রাহিম (আ.) ১৭৫ থেকে ১৯৫ বছর, তাঁর দুই পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) ১৩৭ বছর ও হযরত ইসহাক (আ.) ১৮০ বছর এবং পৌত্র হযরত ইয়াকুব (আ.) ১৪৭ বছর জীবিত ছিলেন। মিশরের বিখ্যাত শাসক ও নবী হযরত ইউসুফ (আ.) ১১০ বছর, ধৈর্যের প্রতীক হযরত আইয়ুব (আ.) ৯২ বছর, হযরত শুআইব (আ.) ১৪০ বছর এবং হযরত মুসা (আ.) ১২০ বছর ও তাঁর ভাই হযরত হারুন (আ.) ১২২ বছর বয়সে ওফাত লাভ করেন। এছাড়া হযরত দাউদ (আ.) ১০০ বছর, তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান (আ.) ৫৩ বছর, হযরত জাকারিয়া (আ.) ৯২ বছর এবং তাঁর পুত্র হযরত ইয়াহইয়া (আ.) মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সে শহীদ হন।
হযরত ঈসা (আ.)-কে ৩৩ বছর বয়সে জীবিত আকাশে তুলে নেওয়া হয় এবং আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ৬৩ বছর বয়সে মদীনা মুনাওয়ারায় ওফাত লাভ করেন; বাকি নবীগণ—যেমন হযরত হূদ (আ.) ১৫০ বছর, হযরত ছালেহ (আ.) ৫৮ বছর, এবং হযরত লূত (আ.), হযরত যুল-কিফল (আ.), হযরত ইলিয়াস (আ.), হযরত আল-ইয়াসা (আ.) ও হযরত ইউনুস (আ.)-এর সঠিক জীবনকাল শতভাগ নিশ্চিত জানা না গেলেও তাঁরা প্রত্যেকেই সুদীর্ঘ সময় দ্বীনের খেদমত করেছেন।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কুরআনে এই প্রধান ২৫ জনের নাম ও জীবনকাহিনী বিস্তারিত তুলে ধরার মূল উদ্দেশ্য হলো—যাতে শেষ জামানার মানুষ তাঁদের কঠিন পরীক্ষা, ধৈর্য, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জীবনকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে পারে।