মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াল ও রক্তক্ষয়ী গণহত্যা বলতেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে এডলফ হিটলার কিংবা তার গ্যাস চেম্বারের কথা। তবে ইতিহাস কেবল এক চাবুকের দাগই মনে রেখেছে; তার চেয়েও বীভৎস, লোমহর্ষক এবং দীর্ঘমেয়াদি এক মানবতাবিরোধী নির্মমতা ঘটেছিল আফ্রিকার বুকে, যার কারিগর বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড। প্রায় আড়াই দশক ধরে কঙ্গোকে নিজের ‘ব্যক্তিগত বাগান’ বানিয়ে আক্ষরিক অর্থেই এক কোটি মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল তার অর্থের পাহাড়। ইতিহাসবিদদের মতে, নির্মমতা ও বীভৎসতার দিক থেকে দ্বিতীয় লিওপোল্ড এমন এক কালো অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিলেন, যা শিউরে ওঠার মতো।
উনিশ শতকের শেষভাগে কঙ্গোর প্রাকৃতিক রাবার ও হাতির দাঁতের অঢেল সম্পদ কুক্ষিগত করতে পুরো অঞ্চলটিতে নিজস্ব রাজত্ব কায়েম করেন লিওপোল্ড। ‘ফোর্স পাবলিক’ নামে গঠিত তার ব্যক্তিগত বাহিনীকে দিয়ে নিরীহ কঙ্গোবাসীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো দাসত্ব। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ রাবার সংগ্রহ করে না দিতে পারলে নেমে আসত অমানুষিক শাস্তি—যার প্রধান রূপ ছিল ‘হাত কেটে ফেলা’। পুরুষদের পাশাপাশি অবোধ শিশু ও নারীদের ডান হাত বা পা কেটে দেওয়া হতো এবং কেটে ফেলা কাটা হাতের বস্তা স্তূপ করে দেখানো হতো রাজকীয় কর্মকর্তাদের।
টার্গেট পূরণে ব্যর্থ হলে পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, মেয়েদের ওপর অত্যাচার এবং প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। রাবারের লোভ মেটাতে গিয়ে শুধু গণহত্যাই নয়, অনাহার আর কৃত্রিম মহামারী তৈরি করে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন কঙ্গোর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ১ কোটি মানুষ)।

পরের রক্ত ও ছিন্ন হাতের বিনিময়ে সংগৃহীত ধনসম্পদ দিয়ে রাজা লিওপোল্ড বেলজিয়ামে তৈরি করেছিলেন প্রাসাদ ও বিলাসবহুল স্মৃতিসৌধ। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যুদ্ধের অপরাধে হিটলারের নাম সর্বত্র চর্চিত হলেও পকেটের লোভে একটি স্বাধীন জাতিকে এভাবে পঙ্গু ও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া ‘কঙ্গোর এই কসাই’ দীর্ঘকাল ছিলেন অন্তরালে।
মৃত্যুর আগে নিজের সমস্ত অপরাধের নথিপত্র পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, কাটা হাতের ছবি ও ইতিহাসের পাতায় লেগে থাকা রক্তের দাগ প্রমাণ করে—পৃথিবীর বুকে নেমে আসা অন্যতম হাড় হিম করা নরকের সৃষ্টিকর্তা ছিলেন এই দ্বিতীয় লিওপোল্ড।