১০ লাখ টাকা যৌতুক না দিলে অন্য বিয়ের হুমকি, গলা টিপে হত্যার চেষ্টা
শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১৯ বছরের তরুণীর আদালতের শরণাপন্ন
১০ লাখ টাকা যৌতুক না দিলে ঘরে তুলে আনা যাবে না, দিতে হবে ৫ ভরি স্বর্ণালংকার এবং বিয়ের উপহার সামগ্রী—এমন দাবি পূরণ না করায় ১৯ বছর বয়সী এক কলেজছাত্রীকে গলা চেপে শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টা, কিল-ঘুষি-লাথি মেরে এক কাপড়ে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং মোবাইল ফোন ভেঙে দেওয়ার লোমহর্ষক অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি কেবল এক দাম্পত্য কলহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অভিযুক্ত স্বামী চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ততম চান্দগাঁও এলাকার সানোয়ারা ইসলাম বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক এনামুল হক (৩৪)।

সানোয়ারা ইসলাম বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক এনামুল হক (৩৪)
একজন শিক্ষকের হাত থেকে এমন নির্দয় ও নিষ্ঠুর আচরণের পর অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয়ে আদালতের দরজায় কড়া নেড়েছেন কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ওই শিক্ষার্থী।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১ মে, ২০২৬ ইং তারিখে ইসলামী শরিয়ত ও রেজিস্ট্রিকৃত নিকাহনামার মাধ্যমে চকরিয়ার এনামুল হকের সাথে ওই তরুণীর বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়েতে ১৪ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা হলেও ৭ লাখ টাকা বকেয়া রয়ে যায়। অভিযোগকারী তরুণীর দাবি, বাসর রাত থেকেই তাঁর ওপর শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক তাণ্ডব। তরুণীর শারীরিক গঠন নিয়ে কটু কথা বলা, গায়ে হাত তোলা এবং বিবাহপূর্ব বন্ধুদের সাথে সম্পর্কের ভুয়া অভিযোগ এনে নিয়মিত মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকেন স্বামী এনামুল। নালিশী দরখাস্তে স্বামীর পরিবারের আরও ৫ সদস্যের বিরুদ্ধে এই নির্যাতনে প্ররোচনা ও সহযোগিতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

ঘটনার চূড়ান্ত মোড় নেয় গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে। চট্টগ্রাম শহরে স্বামীর ভাড়া বাসায় এনামুল হকের ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য তরুণীর কাছে এককালীন ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। তরুণী ও তাঁর পরিবার এই বিপুল অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে উন্মত্তের মতো ঝাপিয়ে পড়েন শিক্ষক স্বামী। তরুণীকে বেধড়ক চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি ও লাথি মারার পাশাপাশি একপর্যায়ে গলা চেপে ধরে আঁচড়াতে আঁচড়াতে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। নির্যাতন থামেনি সেখানেই; তরুণীর বাবা উপহার দেওয়া প্রায় ৫০ হাজার টাকা দামের একটি আইফোন কেড়ে নিয়ে মেঝেতে আছাড় মেরে পা দিয়ে মাড়িয়ে ভেঙে ফেলেন এনামুল। এরপর আলমারিতে রাখা ৫ ভরি স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নিয়ে মধ্যরাতে চুলের মুঠি ধরে এক কাপড়ে তরুণীকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। সে সময় স্বামী হুমকি দেন—১০ লাখ টাকা না দিলে তিনি অন্যত্র বিয়ে করবেন।

খবর পেয়ে গভীর রাতে স্বজনরা এসে রক্তাক্ত ও মারাত্মক আহত অবস্থায় উদ্ধার করে পরদিন ১০ সেপ্টেম্বর চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে ভর্তি করান তরুণীকে। হাসপাতালের চিকিৎসাপত্রও মামলার এজাহারে যুক্ত করা হয়েছে।
এরপর নিরাপত্তার শঙ্কায় ওই শিক্ষার্থী ঈদগাঁওয়ের ইসলামাবাদ ইউনিয়নের ইউছুফেরখীল গ্রামে নানার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু গত ১২ সেপ্টেম্বর রাতে সেখানেও ঘটে আরেক ন্যক্কারজনক ঘটনা। আপোষ-মীমাংসার অজুহাতে এনামুল হক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা নানার বাড়িতে গিয়ে পুনরায় ১০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে অনড় থাকেন। এমনকি বিয়ের উপহার ও ৫ ভরি স্বর্ণ বিক্রি করে চট্টগ্রামে এনামুলের ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তরুণীর পরিবার এর প্রতিবাদ করলে তাঁদের জীবননাশের হুমকি, তরুণীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করার ভয় দেখানো হয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী তরুণী বাদী হয়ে কক্সবাজারের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সি আর মামলা (মামলা নং- ৪৫৪/২০২৬ইং) এবং বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর (লিগ্যাল এইড) ও সিভিল জজ আদালতে বিরোধ মামলা (মামলা নং- ২৬৯০/২০২৬ইং) দায়ের করেছেন। মামলায় বকেয়া ৭ লাখ টাকা মোহরানা আদায়, ৫ ভরি স্বর্ণালংকার ও উপহার সামগ্রী ফেরত, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার হুমকির বিচারের পাশাপাশি নিজের জীবনের নিরাপত্তা ও আদালতের সরাসরি সুরক্ষা চেয়েছেন তিনি।

যে শিক্ষক ক্লাসরুমে হাজারো শিক্ষার্থীকে নীতি, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেন—তার নিজেরই ১৯ বছরের এক শিক্ষার্থীর ওপর চালানো এই বর্বর নির্যাতন আজ গোটা সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চট্টগ্রাম নগরীর সানোয়ারা ইসলাম বালক উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি এমন গুরুতর অভিযোগের মুখে নিজস্ব কোনো তদন্ত বা প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, নাকি অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা চলবে—তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। বাদিনী এখন শুধুই অপেক্ষায়—আদালতের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির।
সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
গুরুত্বপূর্ণ এই সংবাদটি অন্যদের জানাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।