নাগরিক নিরাপত্তা মারা যাওয়ার নির্মম চিত্রপট!
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের পাতা উল্টালে যেন এক একটি বিভীষিকা চোখের সামনে ফুটে ওঠে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় দেশের নাগরিকরা আজকাল দোয়া করেন—আগামীকাল যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা সহিংসতার মুখোমুখি হতে না হয়। মানুষের মনে কেন এই সার্বক্ষণিক ভয় ও উৎকণ্ঠা কাজ করছে, তার উত্তর মিলছে প্রতিদিনের সংবাদের ভয়াবহতার দিকে তাকালেই।
চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া এলাকার সৈয়দ শাহ সড়কে গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) রাতে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে, যেখানে পুলিশ ইতিমধ্যে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং ও জায়গা দখলে জড়িত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। কিশোর গ্যাংয়ের এই তাণ্ডব আজ পুরো দেশে মহামারি আকার ধারণ করেছে, যা দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চট্টগ্রাম রেঞ্জজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর নির্দেশে পরিচালিত এই ক্র্যাকডাউনে কুমিল্লায় এক রাতে ৬২৪ জন, চাঁদপুরে ৩৭০ জন, লক্ষ্মীপুরে ২৪৪ জন, নোয়াখালীতে ১৭১ জন এবং ফেনীতে ৩৮ জনসহ প্রায় দেড় হাজার কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়, যাদের বড় একটি অংশকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছাড়া হলেও অনেকের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে আইনি ব্যবস্থা।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী সারা দেশে সক্রিয় ৩৮৬টি কিশোর গ্যাংয়ের প্রায় সোয়া ৪ হাজার সদস্যের ৮০ শতাংশই ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ, আর চট্টগ্রাম মহানগরীতেই ৯৮টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে; পটপরিবর্তনের পর যাদের নিয়ন্ত্রক পাল্টালেও বন্ধ হয়নি আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের সাথে হাত মিলিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া, গুলি, চাঁদাবাজি ও মাদক বাণিজ্য, যা মাঝে মাঝে পুলিশ বাহিনীর ওপরও হামলা চালাচ্ছে।
কিশোর গ্যাংয়ের এই নৈরাজ্যের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক অঙ্গনেও ভর করেছে এক চরম অন্ধকার ও মানবিক অবক্ষয়। নড়াইলে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের প্রতিবাদ করায় এক নিরীহ ভ্যানচালককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে, অন্যদিকে খুলনায় ‘ভাত চুরির’ অপবাদ দিয়ে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাতকে।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো খবর মিলছে রক্তের সম্পর্ক ও পারিবারিক কাঠামোর ভেতর থেকেই। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সাবেক স্ত্রী দ্বিতীয় বিয়ে করায় সেই প্রতিশোধ নিতে নিজের ১৪ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্র ছেলে নাঈমকে ডেকে এনে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে তার জন্মদাতা বাবা ইব্রাহিম খলিল, যা তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারও করেছেন। একইভাবে বান্দরবানের সুয়ালকে পারিবারিক বিরোধের জের ধরে আপন চার বছরের ভাতিজিকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে তার ফুফু, আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে পানি খাওয়ানোর অজুহাতে ঘরে ডেকে নিয়ে সাত বছরের অবোধ ভাতিজিকে নির্মমভাবে হত্যার অভিযোগ উঠেছে আপন চাচার বিরুদ্ধে। রাজপথের কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব থেকে শুরু করে ঘরের ভেতরের এই আপনজনদের নৃশংসতা—সব মিলিয়ে এক চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের ভেতর দিন কাটাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ।
নিয়মিত এমন মর্মান্তিক ও ভয়াবহ খবরের মুখোমুখি হয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা আজ স্বাভাবিকভাবেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। রাজপথে কিশোর গ্যাংয়ের নৃশংসতা, মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট কিংবা ঘরের চার দেয়ালের ভেতরের ভয়াবহ সহিংসতা—সব মিলিয়ে প্রতিটি ক্ষণে বেঁচে থাকাটাই এখন এক চরম অনিশ্চয়তার নাম। অপরাধীদের সাময়িক গ্রেপ্তার করা হলেও সামাজিক অবক্ষয়ের মূল উৎপাটন এবং আইনের সর্বোচ্চ কঠোরতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে নাগরিক জীবনের এই তাড়া করে ফেরা আতঙ্ক কোনোদিনই দূর হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত ভয় ও আশঙ্কার সাগরে ডুবে থাকা সাধারণ মানুষ আজ তাই বাধ্য হয়েই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে—আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর বুক থেকে ‘নাগরিক নিরাপত্তা’ নামক মৌলিক বিষয়টি চিরতরে মারা গিয়েছে।
সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
গুরুত্বপূর্ণ এই সংবাদটি অন্যদের জানাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।