শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। রক্তক্ষয়ী একটা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর সমস্যাপ্রবণ এই জাতির নেতৃত্বের ভার এখন উনার হাতে। বাহ্যিকভাবে অনেকেই যখন এই রাষ্ট্রের সমস্যাগুলো মোকাবেলায় উনার পারদর্শীতা নিয়ে আলোচনা করছি, তখন পুরো বিশ্ব আলোচনা করছে উনার নতুন ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্ব নিয়ে। উনার ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্ব শুধুমাত্র একটি নতুন সমাজব্যবস্থার কথা বলে না, বরং একটি নতুন মানবিক ও টেকসই পৃথিবীর স্বপ্ন আঁকে। তার প্রস্তাবিত ‘থ্রি জিরো’ বা তিনটি শূন্য হলো: শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নির্গমন। আমাদের এই বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সংকট এবং উন্নয়নের বর্তমান ধারা বিবেচনা করলে এটি একটি নতুন ও যুগান্তকারী দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রফেসর ইউনুসের এই ধারণার মূলে রয়েছে কিছু মৌলিক দর্শন যা বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে মানবিক ও টেকসই পথে পরিচালিত করতে পারে। তার মতে, আমাদের সমাজের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় চারটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া দরকার: তারুণ্যের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার, সামাজিক ব্যবসার প্রসার এবং সুশাসন। তারুণ্যের উদ্যম ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন দিয়ে বর্তমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সামাজিক ব্যবসা: একটি মানবিক পুঁজিবাদ
প্রফেসর ইউনুসের ধারণায়, সামাজিক ব্যবসা কেবল মুনাফার উদ্দেশ্যে নয়, বরং সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধানে পরিচালিত হবে। এই ব্যবসার উদ্দেশ্য হবে একটি মানবিক পুঁজিবাদ গড়ে তোলা, যেখানে লাভের চাইতে সামাজিক পরিবর্তন, মানবিক উন্নয়ন এবং মানুষের প্রকৃত সম্ভাবনা বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই ধারণা বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি। ইউনুস বিশ্বাস করেন যে বর্তমানের মুনাফাকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা শুধুমাত্র লোভ ও স্বার্থকে উৎসাহিত করে যা মানবজাতির প্রয়োজনীয় গুণাবলী যেমন সহমর্মিতা, ত্যাগ ও আদর্শের সাথে বিরোধ সৃষ্টি করে।
সুশাসন এবং ন্যায় বিচার: ‘থ্রি জিরো’ বাস্তবায়নের মৌলিক চাবিকাঠি
সুশাসন ছাড়া ইউনুসের ‘থ্রি জিরো’ ধারণা কার্যকর হতে পারবে না। ন্যায়বিচার, মৌলিক অধিকার, লিঙ্গ সমতা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক একটি প্রশাসনিক কাঠামোই সমাজকে টেকসই উন্নয়নের পথে পরিচালিত করতে পারে। সুশাসন না থাকলে, সামাজিক ব্যবসা যেমন বিকশিত হতে পারবে না, তেমনি দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণও অসম্ভব হয়ে উঠবে।
নতুন প্রজন্মের জন্য দায়িত্ব
বর্তমান যুব সমাজের সৃজনশীলতা এবং ‘ক্যান-ডু’ মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে ‘থ্রি জিরো’ ধারণা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইউনুস মনে করেন, তরুণদের মধ্যে অসীম সম্ভাবনা রয়েছে এবং তাদের স্বাধীনতা, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং নির্দেশনা দেওয়া গেলে তারা ভবিষ্যতে এক নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে। তাদের শক্তিকে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করাই হবে ‘থ্রি জিরো’ ধারণার প্রধান লক্ষ্য।
শেষকথা: একটি টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন
প্রফেসর ইউনুসের প্রস্তাবিত ‘থ্রি জিরো’ হলো আমাদের বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজকে একটি মানবিক ও টেকসই পথে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রয়াস। যদি বর্তমান প্রজন্ম তারুণ্যের উদ্যম, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার, সামাজিক ব্যবসার প্রসার এবং সুশাসনকে ভিত্তি করে ‘থ্রি জিরো’ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়, তবে সত্যিই একটি ন্যায়সংগত, দারিদ্র্যহীন এবং পরিবেশবান্ধব পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
একটি মানবিক পৃথিবীর জন্য প্রফেসর ইউনুসের এই স্বপ্ন শুধু এক বিশেষ মুহূর্তের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের জন্য আমাদের উন্নয়ন কৌশল হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। এটি শুধুমাত্র সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নয়, বরং একটি টেকসই সভ্যতার ভিত্তি গড়তে সহায়ক হবে।
লেখক: দাঊদ আরমান
সম্পাদক, খবর ২৪ ঘন্টা