২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সময় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া ছাত্র জনতার আন্দোলন এবং সংঘর্ষে দেশের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার মতো ট্রাফিক পুলিশ বক্সগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা সাময়িকভাবে এসব ট্রাফিক বক্সে দায়িত্ব পালন করলেও, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ট্রাফিক বিভাগ পুনরায় দায়িত্ব নেয়।
আন্দোলন পরবর্তী পুলিশের কর্মবিরতি ও পুনর্বাসন
৬ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ পুলিশ অধস্তন কর্মচারী সংগঠন কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়। তবে ১২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকের পর আন্দোলনকারী পুলিশ সদস্যরা কাজে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম এবং কনস্টেবল শোয়াইব হাসান গণমাধ্যমকে এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছিলেন।
এরপর চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাফিক পুলিশ বক্স সংস্কার শুরু হয়। যেমন, সম্প্রতি চকবাজারের গুলজার মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ বক্স মেরামত করে ট্রাফিক বিভাগ তাদের দায়িত্বে পুনরায় নিয়োজিত হয়।
আন্দোলনের সময় এবং পরে শিক্ষার্থীরা অনেক ট্রাফিক বক্সের দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনের দায়িত্ব ফিরে পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের এই দায়িত্ব ট্রাফিক বিভাগকে হস্তান্তর করা হয়। তবে দায়িত্বে ফিরে এসে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। একজন পরিচয় গোপন রাখা পুলিশ সদস্য জানান, দায়িত্ব পালনে তাদের এখনো অনেক বাধা ও সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ট্রাফিক পুলিশের প্রধান সমস্যাগুলো
১. শ্রবণশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি
যানবাহনের অহেতুক হর্ন বাজানোর কারণে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের শ্রবণশক্তি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অত্যধিক শব্দ দূষণ তাদের কেবল মানসিক চাপই বাড়ায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ক্লান্তি ও স্নায়বিক জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে গিয়ে তারা তীব্র মানসিক চাপ, মনোযোগে বিঘ্ন এবং স্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হন।
২. বেপরোয়া গতি ও সড়ক দুর্ঘটনা
দায়িত্ব পালনকালে বেপরোয়া গতির যানবাহন প্রায়ই ট্রাফিক সদস্যদের আঘাত করে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আহত ট্রাফিক সদস্যদের জন্য তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে না, ফলে তাদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি, দুর্ঘটনার পর অধিকাংশ চালক পালিয়ে যায়, ফলে অপরাধীদের শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই অবহেলা কেবল ট্রাফিক সদস্যদের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং সড়ক ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামোকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৩. দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন
ট্রাফিক পুলিশদের প্রতিদিন দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ডিউটি করতে হয়, যা তাদের শারীরিক স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলে। এর ফলে প্রস্রাব-পায়খানা জনিত সমস্যা, পায়ের তীব্র ব্যথা, এমনকি ভেরিকোস ভেইন-এর মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে উঠছে। প্রয়োজনীয় শৌচাগারের অভাব এবং দীর্ঘসময় বিরতিহীন কাজের চাপ তাদের শারীরিক এবং মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের কাজে অক্ষম করে তোলে। এটি কেবল তাদের জীবনের মান নষ্ট করছে না, বরং সড়ক ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক দক্ষতাকেও ব্যাহত করছে।
৪. শৌচাগারের অভাব
ট্রাফিক পুলিশ বক্সগুলোতে শৌচাগারের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এই অভাবের কারণে ডিউটির সময় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন দোকান বা অননুমোদিত স্থানে যেতে বাধ্য হতে হয়। এটি কেবল অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে না, বরং তাদের কাজের সময় ব্যাঘাত ঘটায় এবং মর্যাদাহানির শিকার হতে বাধ্য করে। এমন পরিস্থিতি তাদের শারীরিক অসুবিধা ও মানসিক চাপকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
৫. চালকের দুর্ব্যবহার
অনেক সময় চালক ও সহকারীদের দ্বারা ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটে। এই ধরনের আচরণ কেবল তাদের দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে না, বরং তাদের মানসিক চাপ এবং হতাশা বাড়িয়ে দেয়। দায়িত্ব পালনের সময় এ ধরনের অসম্মানজনক পরিস্থিতি তাদের মনোবল ও কার্যক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৬. ফিটনেসবিহীন যানবাহন
বিআরটিএ কর্তৃক অনুমোদিত ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে চলাচল করে, যা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। এসব অবৈধ যানবাহন চলাচল করার কারণে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। অনেক সময় এসব যানবাহন দুর্ঘটনার কারণ হয়ে ওঠে, যা পুলিশের দায়িত্ব পালনের সময় তাদের জীবনের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনে।
প্রশাসনের প্রচেষ্টা ও সম্ভাব্য সমাধান
১. জনবল ও সুরক্ষা সরঞ্জাম
পুলিশের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও আধুনিক সরঞ্জাম বরাদ্দ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
২. শৌচাগারের ব্যবস্থা
ট্রাফিক বক্সগুলোতে শৌচাগার নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা
ট্রাফিক পুলিশদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা চালুর বিষয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
৪. দুর্ব্যবহার প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা
ট্রাফিক আইন মেনে চলার জন্য গণসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চালকদের দুর্ব্যবহার কমানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যেতে পারে।
৫. ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান
ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানোর মাধ্যমে দুর্ঘটনা রোধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ট্রাফিক পুলিশের ওপর আরোপিত দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের কাজের পরিবেশ উন্নত করতে এখনো অনেক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সহযোগিতা পেলে এই সমস্যা সমাধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব বলে মনে করেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা।