চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সম্প্রতি এক বিস্ময়কর এবং নৈতিক প্রশ্নবিদ্ধ সম্পর্কের খোঁজ পাওয়া গেছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ – দুই বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক শক্তি হলেও, চট্টগ্রাম মহানগরীতে দেখা যাচ্ছে কিছু বিএনপি নেতাকর্মী আওয়ামী লীগের চিহ্নিত অপরাধীদের পুনর্বাসন, ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং সংগঠন পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছেন। এতে করে একদিকে দলের আদর্শ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ছড়াচ্ছে।
প্রেক্ষাপট: অত্যাচারের ইতিহাস
২০০৯ থেকে ২০২৪ – এই দীর্ঘ ১৫ বছরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। দলীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৬২ লাখেরও বেশি নেতাকর্মী দেড় লাখের বেশি মামলায় হয়রানির শিকার হন। গুম, খুন, ফোন করে হুমকি – এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যার কোনো বিচার হয়নি।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মানুষের মাঝে আশার আলো জাগে বিএনপিকে ঘিরে। কিন্তু বাস্তবতা যেন অন্য গল্প বলছে।
কথিত যুবদল নেতা আরিফুল ইসলামের বিতর্কিত সংযোগ
চকবাজার থানা এলাকায় ‘কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (CAB)’-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মোহাম্মদ আব্দুল আলিম – আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের ঘনিষ্ঠ এবং অতীতে নির্যাতন মামলার আসামি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সাম্প্রতিক অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়, ফলে আলোচনায় আসে তার সঙ্গে যুবদল নেতা পরিচয়ধারী আরিফুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতা ও সম্পর্ক।

সূত্র বলছে, ক্যাব এর স্থানীয় কমিটিতে আরিফুল ইসলামই আব্দুল আলিমকে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করেন। রাজনৈতিক আদর্শকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কীভাবে একজন বিরোধী দলের কর্মী এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন, তা নিয়ে জনমনে প্রবল প্রশ্ন উঠেছে।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ – ক্যাব এর সভাপতি আব্দুল আলিম
আওয়ামী পরিবারের সেবক – আব্দুল্লাহ আল সুমনের কাহিনী
আরেক আলোচিত নাম আব্দুল্লাহ আল সুমন। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ঘনিষ্ঠ এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকার ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বিতর্কিত তিন ভাই—রবিউল ইসলাম রাজু (ছাত্রলীগ), শরীফ (যুবলীগ) ও সাজ্জাদ (শ্রমিক লীগ)-এর অর্থদাতা ও কৌশলগত পরামর্শক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

এই তিনজনের অবৈধ ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক দাপট এলাকাবাসীকে নাজেহাল করেছে দীর্ঘদিন। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় আহতদের ওপর হামলার জন্য ছাত্রলীগ নেতা রাজু বিশেষভাবে আলোচিত ছিলেন।

অথচ এখন শোনা যাচ্ছে, এসব পরিবারের কিছু সদস্য বিএনপি’র ছাতার নিচে এসে পুরনো অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে, আর অন্য সদস্যরা দলের কর্মী পরিচয়ে সাফাই গাইছেন।
জনগণের প্রশ্ন: আদর্শ না সুবিধা?
তৃণমূলের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—বিএনপি যদি সত্যি এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাতে চায়, তাহলে এ ধরনের ব্যক্তি ও চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে কবে? আদর্শিক শত্রুদের পুনর্বাসন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, এমনকি সাংগঠনিক দায়িত্বে বসানোর ঘটনা দলীয় ভাবমূর্তি ধ্বংস করছে।
এই ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা দলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যেভাবে জনতার মাঝে নতুন আশার বার্তা পৌঁছে দিতে চাচ্ছেন, সেই উদ্যোগকে ম্লান করে দিচ্ছে মাঠপর্যায়ের এসব অসংগতিপূর্ণ কর্মকাণ্ড।