বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নতুনভাবে দাঁড় করানোর কথা বলে আসছে। বিশেষত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অসদাচরণের দায়ে সাত হাজারেরও বেশি সদস্যের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি কঠিন এবং সাহসী সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—যখন দলের নেতাকর্মীরা একের পর এক অপকর্মে ধরা পড়ছেন, তখন শুধুমাত্র বহিষ্কার করলেই কি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে?
সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি প্রবণতার প্রতিফলন। সিরাজগঞ্জে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে মহাসড়ক অবরোধ করেছে শ্রমিকেরা; পিরোজপুরে চাঁদাবাজির দায়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা জামায়াতে যোগ দিয়েছেন; নোয়াখালীতে দলীয় প্যাড অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করেছেন এক সাবেক আহ্বায়ক; লক্ষ্মীপুরে অটোরিকশা স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজির অভিযোগে আরেক নেতা বহিষ্কৃত হয়েছেন। একের পর এক এ ধরনের ঘটনায় বিএনপির শৃঙ্খলার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর সাথে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সহিংসতা, এমনকি খুনোখুনির ঘটনাও যোগ হয়েছে। এগুলো কেবল দলের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং জনসাধারণের মধ্যে বিএনপিকে একটি অসংযত, অপরাধপ্রবণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। বহিষ্কারের পরও সংশ্লিষ্ট নেতাদের অনেকেই অন্য দলে চলে যাচ্ছেন কিংবা প্রভাব খাটিয়ে আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে সাধারণ মানুষ দলের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে তারেক রহমান তরুণ ও নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এ ধরনের আহ্বান যুগোপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু তরুণরা আজকের দিনে রাজনীতি ভিন্ন চোখে দেখে। তারা রাজনীতিকে চায় স্বচ্ছ, সৃজনশীল এবং জনগণের সেবায় নিবেদিত একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। তারা রাজনীতি থেকে আশা করে জবাবদিহিতা, নৈতিকতা এবং নেতৃত্বের সততা। প্রশ্ন হলো—যখন তরুণরা দেখছে দলের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা বা প্যাড অপব্যবহারের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত, তখন তারা কীভাবে বিএনপিকে একটি বিশ্বাসযোগ্য শক্তি হিসেবে দেখবে? অপরাধে জড়িত নেতাদের কেবল বহিষ্কার করে কি তরুণদের আস্থা অর্জন সম্ভব? নাকি এটি প্রমাণ করছে যে দলের ভেতরে এমন মানুষ ঢুকতে পেরেছে যাদের কোনো আদর্শ নেই, আছে কেবল সুযোগসন্ধানী মনোভাব?

অঙ্গসংগঠনগুলোর অবস্থাও কম সংকটময় নয়। ছাত্রদল, যুবদল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল—প্রত্যেক সংগঠনেই অনিয়ম ও অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে প্রায়ই। অথচ এ সংগঠনগুলোই হওয়ার কথা ছিল জনতার কাছে বিএনপির মুখপাত্র, আদর্শিক ধারক ও বাহক। যদি অঙ্গসংগঠনগুলো অপরাধের আখড়া হয়ে ওঠে, তবে আগামী নির্বাচনে বিএনপি যে তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে চায়, তা আদৌ সম্ভব হবে কি?
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন সামনে। প্রায় ১৫ বছর পর বহু তরুণ প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তারা সোশ্যাল মিডিয়া, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় বাস্তবতায় প্রতিটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছেন। বিএনপি যদি এখনই নিজেদের শুদ্ধ না করে, তবে এই তরুণ প্রজন্মই তাদেরকে আরও বেশি অবিশ্বাসের চোখে দেখবে। ইতিহাস প্রমাণ করে, তরুণরা যখন কোনো দলকে অবিশ্বাস করে, তখন সেই দল ক্ষমতায় ফেরা তো দূরের কথা—রাজনীতির মূলধারাতেই টিকে থাকতে হিমশিম খায়।
সুতরাং, বিএনপির জন্য এখন সময় বহিষ্কারের চেয়ে বেশি কিছু করার। তাদের উচিত একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে কোনো অভিযোগ ওঠার আগেই তা তদন্ত করে সমাধান করা যায়। অঙ্গসংগঠনের নেতাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতা বিষয়ক কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে। পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু বহিষ্কার নয়, বরং প্রকাশ্যে দায় স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। এতে ভোটাররা বুঝবে, বিএনপি সত্যিই পরিবর্তন চায়।
জনগণ আর মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাস করে না। তারা চায় বাস্তব পরিবর্তন, স্বচ্ছ রাজনীতি এবং নৈতিক নেতৃত্ব। বিএনপি কি সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রস্তুত? নাকি বহিষ্কারের খাতা ভারী করেই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত থাকবে? এর উত্তর নির্ধারণ করবে শুধু দলের ভবিষ্যৎ নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎও।
শেষকথা হলো, বহিষ্কার দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন গভীর আত্মসমালোচনা, সাংগঠনিক শুদ্ধি এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার বাস্তব প্রয়োগ। না হলে বিএনপি যতই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিক না কেন, তরুণ ভোটাররা তাদেরকে নতুনভাবে আস্থা করবে না। বরং তারা বিএনপিকে পুরনো অপরাধপ্রবণ ও ক্ষমতালোভী দলের রূপেই দেখবে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিকে এই বাস্তবতা বুঝতে হবে—অপরাধপ্রবণ রাজনীতি দিয়ে নয়, বরং সৎ ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমেই মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব।
লেখক:
দাঊদ আরমান (রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
সম্পাদক – খবর ২৪ ঘন্টা