সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে যে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে—গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তর করার উচ্চপর্যায়ের টিম হিসেবে—তাতে এক গভীর দুশ্চিন্তা জমে উঠেছে। ছবি দেখলেই মনে হয়, ইতিহাস এখন কীভাবে গৃহীত হবে, কে ইতিহাস বলবে এবং কাদের সঙ্গে কথা না বলে ইতিহাস লেখা হবে—এসবই প্রশ্নগুলো সামনে উঠে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, সেখানে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের ভূমিকা, ভুক্তভোগীর কণ্ঠ কেমন করে বাদ পড়ছে তা নিয়ে সন্দেহ জন্মে।
এই জাদুঘরের মূল থিম যদি হয় গত ফ্যাসিবাদী আমলের জুলুম-বঞ্চনার চিত্রায়ণ—তাহলে সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডারদের কি হবে? যারা সরাসরি নির্যাতিত, যারা প্রদর্শিত হওয়া উচিত তাদের কণ্ঠ কিই বা হয়নি? ১৬ বছরের হিসাব করলে যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতরাও তারা কি সেখানে সম্মিলিতভাবে উপস্থিত? প্রশ্নগুলো খুবই সহজ অথচ গভীর। ইতিহাস যদি একপক্ষীয় বর্ণনায় গড়া হয়, তাহলে সত্যটা অক্ষত থাকবে কীভাবে?
আরও আঘাত হানে সেই সত্যটিই—যারা ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের শাসনব্যবস্থার সময় নির্যাতিত বা নিপীড়িত হয়েছে, তাদের সঙ্গে কি কোনো সংলাপ হয়েছে? ছাত্রদলের কাউকে কেন এতে রাখা হলো না? যদি এই সংগ্রহটি তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস পড়াবে, সে ইতিহাসে কি প্রকৃত ত্যাগী, আহত ও আন্দোলনকারীদের নাম থাকবে? নাহলে এটি কি কেবল একটি প্রদর্শনী হবে—যেখানে কাহিনি সাজানো হবে, কিন্তু মূল চরিত্ররা অনুপস্থিত থাকবে?
সমন্বয়ক হিসেবে যে নামগুলো উঠছে তাদের ভূমিকাও খেয়াল করা দরকার। সমন্বয়ের কাজ সত্যিকারের ভুক্তভোগী ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপ করা; তাদের স্মৃতি সংগ্রহ করা; যাতে জাদুঘরটি নিঃসঙ্গল, সম্পূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়। যদি সমন্বয়ের নামকেই কেবল কাগজে রেখে দেওয়া হয়, আর বাস্তবে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ না নেওয়া হয়—তাহলে এই উদ্যোগ কেবল রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যর্থ হবে।
বিজ্ঞান ও ইতিহাস জানায়—যতই নিখুঁতভাবে রচনাহীন স্মৃতি লুকানো হবে, ততই পরিণামে সত্য নিজেই আঘাত করবে। যারা ১৬ বছরের হিসাব করতে চাইছে, তাদের উচিত স্মৃতি সংগ্রহে প্রমাণভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি নেনা। যারা আন্দোলনের শুরুর মঞ্চে দাঁড়িয়েছে, যারা প্রাণ দিয়ে লড়েছে—তাদের কণ্ঠ ছেঁটে দিলে ইতিহাস বিপন্ন।
প্রিয় বিএনপি—এই লেখাটা দুঃখভাজন, সতর্কতামূলক ও অনুরোধমূলক সব মিশেলে। অভ্যুত্থানের পর তোমাকে কীভাবে সকল জায়গা থেকে “মাইনাস” করা হয়েছিল, সেটা মনে রাখো; কিন্তু সবকিছু কমিয়ে না ফেলে একেবারে উন্মুক্ত করে দেবার আগে তুমি নিজেই ইতিহাসের দায়িত্ব নাও। সব উদারতা দেখানোর দায়িত্ব শুধু তোমার না—কিন্তু যে বেঈমানেরা তোমাকে ‘মাইনাস’ করার পেছনে ছিল তাদের কথাও মাথায় রাখো, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম সে শিক্ষা থেকে রক্ষা পায়।
শেষ কথা—ইতিহাস যদি সবার জন্য কাছে না থাকে, যদি তা নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির কণ্ঠকেই বাড়তি করে তুলে ধরে আর বাকি কণ্ঠকে ঢেকে রাখে, তাহলে সে ইতিহাস কখনও সত্য বলে গণ্য হবে না। দুঃখ হয় যখন দেখি স্মৃতির জাদুঘর কেবল বর্ণনার খেলায় পরিণত হচ্ছে; কিন্তু আশার দিক হল—যদি আমরা এখনই সতর্ক থাকি, সংলাপ চালাই ও ভুক্তভোগীদের সম্মান দেয়ার মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি বাস্তব, বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস দিতে পারব।
লেখক: শাহরিয়ার শিমুল (কলামিস্ট)