বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যেন ক্রমেই ভয়ানক এক অবিশ্বাসের গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। জনগণ যেখানে ইতিমধ্যেই বিএনপি’র চাঁদাবাজি, দলীয় দখলদারিত্ব আর ভয়ভীতি প্রদর্শনে অতিষ্ঠ, সেখানে এখন নতুন করে সামনে এসেছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ—যাদের ধর্মীয় আবরণে ঢেকে রাখা মুখোশের ভেতর লুকিয়ে আছে আরও এক ভয়ংকর চেহারা।
রাজনীতি, নীতিকথা ও ইসলামি মূল্যবোধের বুলি আওড়ানো এই দলের নেতা-কর্মীরা এখন একের পর এক চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও দখলবাজির ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছেন। আর এতে সাধারণ মানুষ দিশেহারা—এখন তারা প্রশ্ন তুলছে, “বিএনপি যদি দোষী হয়, তবে জামায়াত নির্দোষ থাকে কোন যুক্তিতে?”
রাজিবপুরে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকার দাবি
গত ১৮ জুলাই কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে জামায়াত নেতা আনিসুর রহমান, যিনি শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উপজেলা সভাপতি, মামলা থেকে বাঁচানোর নাম করে এক ব্যবসায়ী বাবু মিয়ার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। ভয় দেখান থানার ওসির নাম ভাঙিয়ে। ফাঁস হওয়া অডিও ও ভিডিওতে স্পষ্ট শোনা যায়—তিনি বাবু মিয়াকে বলেন, “তোমার যদি একটা পশমের ক্ষতি হয়, আমি রাজিবপুরে মুখ দেখাব না… তুমি ৫০ হাজার টাকা রেডি করো।”
ঘটনাটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং পরে তাঁকে দল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। (সূত্র: https://www.ittefaq.com.bd/742186)
ফেনীতে ওসির নাম ভাঙিয়ে টাকার লেনদেন
এর আগে এই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারিতে ফেনী সদর মডেল থানায় আরেক জামায়াত নেতা জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। অভিযোগ—তিনি থানার ওসির নাম ব্যবহার করে এক শিক্ষকের কাছ থেকে টাকা নেন মামলার ভয় দেখিয়ে। অডিও ফাঁস হতেই জেলা জামায়াত কর্তৃপক্ষ তাঁকে বহিষ্কার করে।
তবে জনগণের প্রশ্ন—এমন নেতাদের দল থেকে বের করে দিলেই কি দায় শেষ হয়ে যায়? কারণ দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপিও একই স্ট্র্যাটেজিতে দায় এড়ায়। নাকি এ এক গোটা সাংগঠনিক দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি? (সূত্র: https://bangla.bdnews24.com/samagrabangladesh/63ac04f0fc6e)
নাটোরে চাঁদা না দিলে দোকান দখল
নাটোরের বড়াইগ্রামে জামায়াত নেতা রুহুল আমিন ও তাঁর সহযোগীরা ১০টি দোকানঘরে তালা লাগিয়ে দখল নেন। কারণ? দোকানমালিকরা প্রত্যেকে মাসে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে রাজি হননি। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে পরে দোকানগুলো দখলমুক্ত করা হয় এবং রুহুল আমিনসহ চারজনকে গত ২৯ জুলাই, ২০২৫ তারিখে গ্রেপ্তার করা হয়।
যেখানে ধর্ম ও ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়, সেখানে অসহায় ব্যবসায়ীদের উপর এমন দখলদারিত্ব কি চরম ভণ্ডামির প্রকাশ নয়। (সূত্র: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/f2cj22m7po)
কুষ্টিয়ায় টোল ইজারাদারের ওপর হামলা
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ফত ১৮ জুলাই ‘চাঁদা না পেয়ে’ বাস টার্মিনালের টোল ইজারাদার রাকিব হোসেনের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে জামায়াত নেতা আফজাল হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
রাকিব অভিযোগ করেন, আফজাল হোসেন প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করতেন, না দিলে টোল আদায় করতে দেবেন না বলে হুমকি দিতেন। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করে গুরুতর জখম করেন। পুলিশ বলেছে, এ ঘটনায় চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টার মামলা নেওয়া হয়েছে। (সূত্র: https://bangla.bdnews24.com/samagrabangladesh/0b1a67b11429)
জনগণের দুশ্চিন্তা: কাকে বিশ্বাস করবে এখন বাংলাদেশ?
দেশজুড়ে এমন ঘটনা বারবার ঘটায় এখন সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের সংকট ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। একদিকে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি আর দখলবাজির অভিযোগ; অন্যদিকে জামায়াতও পিছিয়ে নেই। অথচ এই দুটি দলই জনগণের কাছে নিজেদের ‘ন্যায়বিচারের বাহক’, ‘ইসলামী মূল্যবোধের ধারক’ বলে দাবি করে।
তবে বাস্তবতা হলো—যখন ধর্ম ও রাজনীতি মিলে লোভের প্ল্যাতফর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানে ঈমান নয়, স্বার্থই প্রাধান্য পায়। যদি বিএনপিকে চাঁদাবাজির দায়ে জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়, তাহলে জামায়াত কোন যুক্তিতে পার পাবে? জনগণ আজ প্রশ্ন করছে—”আমরা ভোট দেব কাকে, বিশ্বাস করবো কাকে?”
এই ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন, যেখানে ক্ষমতা আর প্রভাবের লোভে ধর্ম, আদর্শ, ন্যায়—সব কিছুই বিসর্জন দেওয়া হয়। বাংলাদেশের মানুষ আর প্রতারণার রাজনীতিতে বিশ্বাস করতে চায় না। তারা চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আর প্রকৃত নেতৃত্ব—যে নেতৃত্ব ভয় নয়, ভরসা জাগাবে।
লেখক: ইমরান এলাহী (মসজিদের ঈমাম, পঞ্চগড়)