আধুনিক জীবনব্যবস্থা আজ অদৃশ্য তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ বা Electromagnetic Fields (EMF)–এর এক বিস্তৃত বলয়ে আবদ্ধ। ব্লুটুথ, ওয়াইফাই, স্মার্ট ওয়াচ, মোবাইল ফোন এবং ৪জি/৫জি নেটওয়ার্ক—এসব প্রযুক্তি থেকে নির্গত নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই দীর্ঘমেয়াদি এক্সপোজার যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর গভীর ও নীরব প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইএমএফ–এর সবচেয়ে প্রমাণিত প্রভাব পড়ছে শুক্রাণুর গুণমান ও সংখ্যার ওপর। পকেটে মোবাইল রাখা বা কোলের ওপর ল্যাপটপ রেখে ওয়াইফাই ব্যবহারের ফলে অণ্ডকোষের আশপাশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশনের সংস্পর্শে এসে শুক্রাণুর গতিশীলতা (Motility) কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণও মিলেছে, যা সরাসরি পুরুষদের উর্বরতা হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত।
এছাড়া গবেষণায় উঠে এসেছে, মোবাইল ও ওয়াইফাই থেকে নির্গত ফ্রিকোয়েন্সি শরীরের নাইট্রিক অক্সাইড উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। এই উপাদানটি লিঙ্গে স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ঘাটতি থেকে ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা যৌন সক্ষমতা ধরে রাখতে সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষত যারা দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন শরীরের কাছাকাছি রাখেন।
ইএমএফ–এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো হরমোনের ভারসাম্যহীনতা। অতিরিক্ত ব্লুটুথ ও ওয়াইফাই সিগন্যাল এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যেতে পারে। এই হরমোন নারী ও পুরুষ উভয়ের যৌন আকাঙ্ক্ষা বা লিবিডোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এর মাত্রা কমলে যৌন অনীহা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ঘুমের ব্যাঘাতও এই সমস্যার একটি বড় দিক। স্মার্টফোন, স্মার্ট ওয়াচ ও অন্যান্য গ্যাজেট থেকে নির্গত সিগন্যাল এবং নীল আলো শরীরের মেলাটোনিন হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়। গভীর ঘুম না হলে শরীর ক্লান্ত থাকে, মানসিক চাপ বাড়ে এবং এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ে যৌন সক্ষমতার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, কৃত্রিম ফ্রিকোয়েন্সির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কোষের ভেতরে Oxidative Stress বাড়িয়ে দেয়, যা প্রজনন অঙ্গের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই ঝুঁকি শুধু পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের ক্ষেত্রেও ইএমএফ একটি নীরব হুমকি। দীর্ঘ সময় ওয়াইফাই ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সংস্পর্শে থাকলে নারীদের প্রধান যৌন হরমোন ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন–এর ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর ফলে যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া, মাসিক চক্র অনিয়মিত হওয়া এবং ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা হ্রাসের আশঙ্কা দেখা দেয়। কিছু গবেষণা গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত রেডিয়েশন ভ্রূণের বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি পরিত্যাগ নয়, বরং সচেতন ও সীমিত ব্যবহারই এই ঝুঁকি কমানোর অন্যতম উপায়। প্রয়োজন ছাড়া শরীরের কাছাকাছি গ্যাজেট রাখা এড়িয়ে চলা এবং রাতে ডিভাইস ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।