আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬—ভ্যালেন্টাইন্স ডে। চারপাশ লাল গোলাপ ও চকোলেটের সমারোহে মনে হতে পারে এটি শুধুই রোমান্টিক এক দিন। কিন্তু ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র ইতিহাস মোটেই আজকের মতো মিষ্টি ছিল না; বরং এতে রয়েছে প্রাচীন রোমান প্রথা, বিদ্রোহ এবং রক্তের ছোঁয়া। ইতিহাসবিদদের মতে, এই দিনটির শুরু হয়েছিল প্রাচীন রোমের ‘লুপারকালিয়া’ উৎসব থেকে, যা পালিত হতো ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি। সেই সময় ছাগল ও কুকুর বলি দেওয়া হতো এবং সেই চামড়া দিয়ে নারীদের হালকা আঘাত করা হতো। বিশ্বাস করা হতো, এতে নারীদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা বা উর্বরতা বাড়বে। খ্রিস্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে গির্জা এই ‘পৌত্তলিক’ প্রথা বন্ধ করে একে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে মিলিয়ে রোমান্টিক রূপ দেয়।

সর্বাধিক জনপ্রিয় ইতিহাসটি হলো পাদ্রি সেন্ট ভ্যালেন্টাইন-এর গল্প। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস মনে করতেন, অবিবাহিত যুবকরাই সেরা সৈনিক। তাই তিনি যুবকদের বিয়ে নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু পাদ্রি ভ্যালেন্টাইন গোপনে প্রেমিক-প্রেমিকাদের বিয়ে পড়াতেন। খবর পেয়ে তাকে বন্দি করা হয় এবং ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। জানা যায়, কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি জেলের অন্ধ মেয়ের চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগে একটি চিরকুট লিখেছিলেন—“From your Valentine,” যা আজও ব্যবহার হয়ে থাকে।

আধুনিক যুগে বড় কোম্পানিগুলো এই দিনটিকে ব্যাপকভাবে প্রচার করে, ফলে এটি কেবল ভালোবাসার দিন নয়, বরং এক বিশাল বানিজ্যিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর মানুষ ভালোবাসার প্রকাশে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করে তা চমকপ্রদ। শুধুমাত্র আমেরিকাতেই ২০২৬ সালে ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে খরচ হবে প্রায় ৩ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে মিলিয়ে এই পরিমাণ কয়েক লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছায়। গড়ে একজন ব্যক্তি এই দিনে প্রায় ২৩ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করেন।
ফুলের কথা বললে সবার আগে আসে লাল গোলাপ। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২৫ কোটি গোলাপ বিক্রি হয়। কেবল যুক্তরাষ্ট্রে এই দিনে ফুলের জন্য মানুষ খরচ করেন প্রায় ৩২ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা। গোলাপের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম স্বাভাবিকের ৩–৪ গুণ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া গয়না, ডিনার ডেট, পোশাক ও চকোলেট-সহ অন্যান্য উপহারেও প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। বিভিন্ন সূত্র জানায়, এই দিনে বিশ্বে গয়নার জন্য খরচ হয় প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকা, বাইরে খাওয়ার জন্য ৬ লক্ষ ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, পোশাকের জন্য ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ক্যান্ডি ও চকোলেটের জন্য ৩ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা, আর শুভেচ্ছা কার্ডের জন্য ১ লক্ষ ৬২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে নিরাপত্তা সামগ্রী বা কন্ডম বিক্রির গ্রাফও আকাশচুম্বী হয়। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র সপ্তাহে কন্ডম বিক্রির হার বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ২০% থেকে ৩০% বেড়ে যায়। কিছু দেশে এই হার আরও বেশি। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ডুরেক্স জানিয়েছিল, ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে তাদের কন্ডম বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫% বেড়ে যায়। এই সময়ে তারা বিশেষ ‘ভ্যালেন্টাইন প্যাক’ বা ‘ফ্লেভারড’ কন্ডম বাজারে আনে।

ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র প্রভাব এক মাস পরও লক্ষ্য করা যায়। মার্চে বিশ্বজুড়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট বিক্রি স্বাভাবিকের তুলনায় ১০% থেকে ১৫% বেড়ে যায়। এটি বোঝায়, উৎসবের জোয়ারে অনেকেই সুরক্ষার কথা ভুলে যান।
ভালোবাসা, লাল গোলাপ, চকোলেট, গয়না—সবকিছুর সঙ্গে মিলিয়ে ভ্যালেন্টাইন্স ডে কেবল একটি রোমান্টিক দিন নয়, এটি একটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক উৎসব ও সামাজিক ঘটনা, যা ইতিহাস, ব্যবসা এবং বাস্তবতার নানা দিককে একত্রিত করে।