হিমালয়ের কোলে শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা এক ছোট্ট রাজ্য— ভুটান। একে বলা হয় ‘ল্যান্ড অফ দ্য থান্ডার ড্রাগন’। আধুনিক পৃথিবীর কৃত্রিমতা আর কোলাহল যেখানে পৌঁছাতে পারেনি, ভুটান ঠিক সেখানেই তার আদিম নির্জনতা আর আধ্যাত্মিকতা নিয়ে টিকে আছে। যে দেশে উন্নয়নের মাপকাঠি টাকা নয় বরং ‘সুখ’, সেই দেশের গল্পগুলো যে আর পাঁচটা দেশের চেয়ে আলাদা হবে, এটাই স্বাভাবিক। মেঘেদের কাছাকাছি থাকা এই দেশটি আজও সারা বিশ্বের কাছে এক পরম বিস্ময়।
চলুন চিনে নেওয়া যাক হিমালয়ের এই মুক্তোকে ৫টি অনন্য তথ্যের মাধ্যমে:
১. জিডিপি নয়, এখানে চলে ‘জিএনএইচ’ (সুখ)
সারা পৃথিবী যখন তাদের উন্নতির হিসাব করে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি (GDP) দিয়ে, ভুটান তখন এক অনন্য পথে হাঁটে। ১৯৭২ সালে ভুটানের চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক ঘোষণা করেন যে, দেশটির উন্নতির মাপকাঠি হবে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ (GNH) বা স্থূল জাতীয় সুখ। এখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর মানসিক প্রশান্তি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়। ভুটানের প্রতিটি মানুষের মুখের হাসিই হলো সরকারের সাফল্যের আসল রিপোর্ট কার্ড।
২. বিশ্বের একমাত্র ‘কার্বন নেগেটিভ’ দেশ
পরিবেশ দূষণ নিয়ে যখন পুরো বিশ্ব চিন্তিত, ভুটান তখন এক আশ্চর্য নজির গড়েছে। এটি পৃথিবীর একমাত্র ‘কার্বন নেগেটিভ’ দেশ। এর অর্থ হলো, ভুটান যতটা কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করে, তার চেয়ে অনেক বেশি শোষণ করে নেয়। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, ভুটানের অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকা সবসময় বনভূমিতে ঢাকা থাকা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৭২ শতাংশ এলাকাই গহীন অরণ্য, যা আমাদের পৃথিবীকে বুক ভরে শ্বাস নিতে সাহায্য করছে।
৩. ট্রাফিক লাইটহীন রাজধানী থিম্পু
ভুটানের রাজধানী থিম্পু বিশ্বের অন্যতম আধুনিক শহর হওয়া সত্ত্বেও এখানে কোনো ট্রাফিক লাইট নেই! একসময় শহরে একটি ট্রাফিক লাইট বসানো হয়েছিল, কিন্তু স্থানীয় মানুষ মনে করেছিল এটি খুব বেশি যান্ত্রিক এবং নির্দয়। তাই সেটি সরিয়ে আবার আগের মতো পুলিশ দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। সাদা দস্তানা পরা ট্রাফিক পুলিশের ছন্দময় হাতের ইশারা দেখা পর্যটকদের কাছে এক দারুণ অভিজ্ঞতা।
৪. সর্বোচ্চ চূড়ায় নিষিদ্ধ আরোহণ
ভুটানের পাহাড়গুলোকে তারা পবিত্র বলে মনে করে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, পাহাড়ের চূড়ায় দেবতারা বাস করেন। তাই মানুষের পদধূলি যেন সেই পবিত্রতা নষ্ট না করে, সেজন্য ভুটানে ৬,০০০ মিটারের বেশি উঁচু পাহাড়ে আরোহণ করা আইনত নিষিদ্ধ। এই কারণেই ভুটানের ‘গাংখার পুয়েনসাম’ (Gangkhar Puensum) হলো পৃথিবীর সর্বোচ্চ অজেয় পর্বতশৃঙ্গ, যেখানে আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ পা রাখতে পারেনি।
ভুটানের ‘গাংখার পুয়েনসাম’ (Gangkhar Puensum) হলো পৃথিবীর সর্বোচ্চ অজেয় পর্বতশৃঙ্গ
৫. প্রথম তামাকমুক্ত ও প্লাস্টিকমুক্ত দেশ
স্বাস্থ্য আর পরিবেশের প্রতি ভুটানের দায়বদ্ধতা অতুলনীয়। ১৯৯৯ সালেই ভুটান তাদের দেশে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল। এছাড়া ২০০৪ সালে ভুটান বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পুরো দেশে তামাক বা ধূমপান কেনাবেচা এবং জনসমক্ষে ধূমপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তাদের এই কঠোর কিন্তু সময়োপযোগী আইনগুলোই দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
ভুটানের এই পাহাড়িয়া শান্ত রূপ আর সুখী মানুষের গল্প কি আপনাকেও একটু থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করল? আধুনিক পৃথিবীর ইঁদুর দৌড় থেকে দূরে ভুটান যেন সত্যিই এক টুকরো স্বর্গ।