দাঊদ আরমান:
১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ ‘চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’। নগরীর কলেজ রোডের একপাশে সবুজ ঘেরা দেব পাহাড়, অন্যপাশে হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ এবং সম্মুখে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ—ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে এই স্কুলের লোকেশন যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঈর্ষণীয়। কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য এখন একদল স্বার্থান্বেষী মানুষের গোয়ার্তুমি আর খামখেয়ালিপনার বলি হচ্ছে।
গতকাল রাতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মূল ফটকটির আর চেনার উপায় নেই। কোচিং সেন্টারের চাকচিক্যময় বিজ্ঞাপন, গৃহশিক্ষকের রঙিন পোস্টার আর ঘর ভাড়ার লিফলেটে ছেয়ে গেছে শতবর্ষী এই বিদ্যালয়ের মূল প্রবেশপথ। কোনো নবাগত ব্যক্তি সেখানে গেলে নামফলক না দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি একটি প্রাচীন ও স্বনামধন্য সরকারি বিদ্যালয়। শিক্ষার আলো ছড়ানোর কারিগর যারা, সেই কোচিং সেন্টারগুলোই যেন এখানে তাদের ‘মূর্খতার’ পরিচয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট করছে।
তবে সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে যা চোখে পড়ে, তা হলো বিদ্যালয়ের মূল নামফলকের ঠিক উপরে টাঙানো এক বিশালাকার রাজনৈতিক ব্যানার। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৯ সংসদীয় আসনের এমপি আলহাজ্ব আবু সুফিয়ান এর ছবি ব্যবহার করে আনিসুজ্জামান সাইমন নামক এক ব্যক্তি এসএসসি ও সম্মান পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদের শুভকামনা জানিয়েছেন। ব্যানারটিতে তিনি নিজেকে ১৬ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে দাবি করেছেন।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অন্যতম প্রধান কাজ হলো সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিচ্ছন্নতা এবং সৌন্দর্য বজায় রাখা। অথচ নিজের প্রচারণার জন্য খোদ সরকারি স্কুলের ফটক ঢেকে দেওয়া একজন ‘ভবিষ্যৎ’ জনপ্রতিনিধির সচেতনতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“মাত্র তো একজন লাগালো, কয়েকদিনের মধ্যে দেখবেন আরও কয়েকজন এসে গেটটি পুরোপুরি ঢেকে ফেলেছে। যারা নিয়ম জানে না, তারা এলাকার সেবা করবে কীভাবে?”
একটি ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথকে যখন এভাবে সাধারণ বিজ্ঞাপনের ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—আমাদের সমাজের নীতিনৈতিকতা আসলে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? যারা নিজেদের প্রচারের স্বার্থে কোমলমতি শিশুদের বিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট করতে দ্বিধা করে না, তাদের কাছে শিক্ষার মান উন্নয়ন বা সুন্দর সমাজ গড়ার প্রত্যাশা করা কতটা যৌক্তিক?
সুশীল সমাজের দাবি, অবিলম্বে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে এই অবৈধ ব্যানার-পোস্টার উচ্ছেদ করে বিদ্যালয়ের মূল ফটকটি উদ্ধার করা হোক এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।