“মুখোশ ভাঙো, আসক্তি ছাড়ো, তামাক—নিকোটিনমুক্ত জীবন গড়ো”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের উদ্যোগে আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন, ২০২৬) নগরীতে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা, তামাক বিরোধী সেমিনার ও বিভাগীয় ত্রৈমাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকালে সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণ থেকে একটি সচেতনতামূলক র্যালি বের হয়ে কাজীর দেউরী মোড় ঘুরে পুনরায় সার্কিট হাউজে এসে শেষ হয়। পরবর্তীতে সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন বাস্তবায়নে করণীয়’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোঃ মোতাহের হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ইনামুল হাছানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ জাহিদ হোসেন মোল্লা, জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম, পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অপু মারমা।

সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন বাস্তবায়নে করণীয়’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন বলেন, তামাকজনিত রোগ, অকালমৃত্যু এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তামাকের বিস্তার ঠেকাতে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ, তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করা এবং বিক্রেতাদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা জরুরি। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর প্রতিবেশ রক্ষায় সরকারি গেজেটের মাধ্যমে হালদা নদীর তীরবর্তী নির্ধারিত এলাকায় সব ধরনের তামাক চাষ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। যুবসমাজকে তামাক ও মাদক থেকে দূরে রাখতে সরকার ক্রীড়া কার্যক্রমের সম্প্রসারণে বদ্ধপরিকর বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধে বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জানান, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় টাস্কফোর্স কমিটির ২৮টি সভা এবং ২০৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে; যেখানে ৩০৪টি মামলায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, শুধু পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করলেই হবে না, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষাও শক্ত করতে হবে।
উন্মুক্ত আলোচনায় আরও অংশ নেন মাউশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-পরিচালক আবদুস সালাম, জেলা ক্রীড়া অফিসার আবদুল বারী, কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ তজল্লী আজাদ, চিটাগাং চেম্বারের প্রতিনিধি হাবীবুর রহমান, শহীদুল আলম, ইলমা’র প্রধান নির্বাহী জেসমিন সুলতানা পারু এবং ইপসার পরিচালক নাসিম বানু শ্যামলী।
তামাক ব্যবহারের ভয়াবহ পরিসংখ্যান:
সেমিনারে তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষতিকর প্রভাবের ওপর কিছু উদ্বেগজনক বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক তথ্য তুলে ধরা হয়:
- বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ৬১ হাজারের বেশি মানুষ তামাকজনিত কারণে মারা যায়, অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রাণ হারাচ্ছেন ১৮ জন।
- দেশের প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং ১৫ বছরের কম বয়সীদের ৬.৯% তামাক সেবন করে। এর মধ্যে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ সরাসরি ধূমপান করে এবং প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক (জর্দা, গুল, খৈনী) ব্যবহার করে।
- বাংলাদেশে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে কোটি কোটি মানুষ; যার মধ্যে ৪ কোটিরও বেশি মানুষ বাসায়, ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ গণপরিবহনে এবং ৮১ লাখ মানুষ কর্মস্থলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। দেশের মোট মৃত্যুর ২.৫১ শতাংশেরই কারণ এই পরোক্ষ ধূমপান।
- দেশের মোট ক্যান্সার রোগীর ৪৬ শতাংশই তামাক ব্যবহারকারী।
- ২০২৪ সালে কেবল বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে দেশে ৪ হাজার ১৩৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এছাড়া প্রতিবছর সিগারেটের প্রায় ১৬ হাজার মেট্রিক টন বিষাক্ত ফিল্টার বর্জ্য হিসেবে এদেশের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
সেমিনারে বক্তারা আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন।