দুটি ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ মহাকাব্যিক লড়াই শেষে বিশ্ব ফুটবলের নতুন শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরলো স্পেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আজ মুখোমুখি হয়েছিল স্পেনের নান্দনিক পাসিং ফুটবল বনাম বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিধ্বংসী রণকৌশল। তবে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ১২০ মিনিটের এক রক্তক্ষয়ী ও শারীরিক শক্তি-নির্ভর লড়াই শেষে ফুটবলেরই জয় হলো। আর্জেন্টাইন ডিফেন্সের ‘ডার্ক আর্টস’কে পরাস্ত করে ১-০ গোলের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ঘরে তুললো ‘লা রোজা’রা। আর এই হারের মাধ্যমেই সম্ভবত চোখের জলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম ট্র্যাজিক সমাপ্তি টানলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহানায়ক লিওনেল মেসি।
ম্যাচটি হয়তো গোলমুখের দারুণ কোনো অ্যাকশন বা নান্দনিক ফুটবলের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে না। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটের অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ম্যাচের ভাগ্য অনেকটা নির্ধারিত হয়ে যায়। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের একের পর এক আক্রমণ আর সামলাতে পারেনি। অবশেষে ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের চমৎকার পাস থেকে বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেস এক দুর্দান্ত শটে বল জালে জড়ান। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে করা এই গোলটিই শেষ পর্যন্ত দুই দলের ব্যবধান গড়ে দেয়।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আজকের এই ফাইনালটি ছিল মূলত নান্দনিক ফুটবলের সাথে ‘অ্যান্টি-ফুটবল’ কৌশলের লড়াই, যেখানে শেষ পর্যন্ত ফুটবলেরই জয় হয়েছে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে যেভাবে অতিরিক্ত শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে আর্জেন্টিনা কুপোকাত করেছিল, আজ স্পেনের বিরুদ্ধে তারা সেই আগ্রাসন আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেয়। স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের একের পর এক ফাউল করে মাঠের বাইরে পাঠানোর এক আগ্রাসী মানসিকতা দেখিয়েছে স্কালোনির শিষ্যরা। এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ডের পাশাপাশি লিয়ান্দ্রো পারেদেসের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা অসংখ্য ফাউল করেছেন এবং ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করেননি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা তাদের লড়াকু মানসিকতার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ালেও, ২০২৬-এর ফাইনালের এই উগ্র আচরণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য তাদের সেই গৌরবময় অতীতকে কিছুটা হলেও কলঙ্কিত করেছে।
লিওনেল মেসির মহাকাব্যিক ক্যারিয়ারের শেষটা (এখনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি) এমন রূপালি মেডেল গলায় আর জলভেজা চোখে হওয়ার কথা ছিল না। পুরো টুর্নামেন্টে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে প্রায় একাই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে টেনে আনা এই কিংবদন্তি জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চেই তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম নিষ্প্রভ ম্যাচটি খেললেন। তবে এর পেছনে সতীর্থদের অতি-আগ্রাসী রণকৌশলই দায়ী; যেখানে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মেসিকে বল যোগান দেওয়ার কথা, সেখানে আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা ব্যস্ত ছিলেন ফাউলের মাধ্যমে স্পেনের আক্রমণভাগকে ভেঙে দিতে। ফলে পুরো ম্যাচে মেসিকে একজন সাধারণ দর্শকের মতো একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
একই সাথে এই মেগা ফাইনালের আয়োজক কমিটির দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। কোটি কোটি ডলার খরচ করে ফাইনালকে জমকালো রূপ দেওয়া হলেও, নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির এই স্টেডিয়ামের খেলার পিচটি ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। এনএফএলের এই কৃত্রিম মাঠটিতে বসানো ঘাস ছিল অত্যন্ত শুকনো, শক্ত ও তালি দেওয়া, যা এত বড় একটি ফাইনালের জন্য ছিল চরম লজ্জাজনক। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে স্পেনের এই জয় ফুটবলের এক নতুন যুগের সূচনা করলো, আর আর্জেন্টাইন ভক্তদের জন্য সান্ত্বনা এটুকুই যে—৪ বছর আগেই মেসি তাঁর সোনালী ট্রফিটি ছুঁয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব অমর করে রেখেছিলেন।
লেখক:
ক্রিশান ডেভিস (সহকারী এডিটর: গোল.কম)