প্রতিদিন সকালে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের দিন শুরু হয় এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফির সতেজতায়। ক্যাফে কিংবা করপোরেট টেবিলে কফির প্রতি চুমুক তৃপ্তি দিলেও, এই চাঙ্গা করা পানীয়টির আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কোটি শিশুর অমানবিক জীবন, শোষণ এবং শৈশব হারানোর করুণ গল্প।
গ্লোবাল মার্চেন্ট ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কফি উৎপাদনকারী দেশগুলোতে প্রায় লক্ষাধিক শিশু নিয়োজিত রয়েছে বিপজ্জনক কফি চাষ ও সংগ্রহের কাজে। লাতিন আমেরিকার গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস কিংবা আফ্রিকার ইথিওপিয়া ও উগান্ডার পাহাড়ি কফি বাগানগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটতে হয় এই কোমলমতি শিশুদের। হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে কফি বিন তোলা, ভারী বস্তা পিঠে বহন করা এবং ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহারের মুখে দাঁড়িয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা অকালেই মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে কফির বিপুল চাহিদা ও বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল ব্র্যান্ডের শতকোটি ডলারের ব্যবসা সত্ত্বেও এর মূল সুবিধা পৌঁছায় না প্রান্তিক কৃষকদের হাতে। মাত্র এক থেকে দুই ডলারের বিনিময়ে সারাদিন রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে কফি বাগানে কাজ করতে বাধ্য হয় হতদরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুরা। ন্যায্য মজুরি না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে মা-বাবার সাথে শিশুরাও বাগানের কাজে নেমে পড়ে, যার ফলে শিক্ষার সুযোগ থেকে তারা স্থায়ীভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।
মেগাসিটিগুলোতে যখন আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে চড়া দামে কফি কেনাবেচা হয়, তখন কফি বাগানের লাখ লাখ শিশুর শৈশব পিষে যায় বাণিজ্যিক মুনাফার যাঁতাকলে। বহুজাতিক সংস্থাগুলো ‘ফেয়ার ট্রেড’ বা ন্যায্য বাণিজ্যের কাগুজে আশ্বাস দিলেও বাস্তবে বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম নির্মূল ও সাধারণ কফি চাষীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক নজরদারির অভাব স্পষ্ট।