অর্থনীতি

ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মহা-লুটপাট ও মেগা দুর্নীতি

আকাশচুম্বী ঋণের পাহাড়, উন্নয়নের নামে মেগা প্রকল্পের অবাধ হরিলুট আর ইতিহাসজুড়ে নজিরবিহীন অর্থ পাচারের এক ভয়ঙ্কর আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির যে কঙ্কালসার ও শিউরে ওঠার মতো সত্য উন্মোচিত হয়েছে, তা দেশের প্রতিটি নাগরিকের চোখ কপালে তোলার জন্য যথেষ্ট। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লুটপাট করা হয়েছে, তার চড়া মাশুল এখন দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে।

​এই চরম আর্থিক বিশৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দেশের বৈদেশিক ঋণের খাত থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১০.৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ লাখ ৩১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা)। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় বিগত সরকার রেখে গিয়েছিল প্রায় ১০৩ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা) ঋণ, যা পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে ২০২৬ সালের শুরুতে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৩.৮ বিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১৩ লাখ ১৯৬৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা)। বর্তমানে সেই ঋণের কিস্তি মেটাতে গিয়ে সরকারের রাজস্ব ভাণ্ডারে টান পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মোট রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, যা স্বাভাবিক প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​তবে অর্থনীতির এই সার্বিক ধসের নেপথ্যে রয়েছে দেশ থেকে সংঘটিত অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন অর্থ পাচারের ঘটনা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘শ্বেতপত্র কমিটির’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন থেকে ২৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকার সমান! ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্যমতে, এ সময়ে প্রতি বছর গড়ে ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা) বিদেশে পাচার করা হয়, যার একটি বড় অংশ বা প্রায় ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা) কেবল ব্যাংকিং খাত থেকেই ভুয়া কাগজপত্র ও নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি মার্কিন এফবিআই (FBI) ও যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের (DOJ) যৌথ তদন্তে হংকং ও কেম্যান আইল্যান্ডস হয়ে মার্কিন ব্যাংকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩,৬০০ কোটি টাকা) পাচারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে, যা নিয়ে বর্তমানে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে আশার কথা হলো, তদন্ত সংস্থার তৎপরতায় দেশের ভেতরে প্রায় ৫৭,১৬৮ কোটি টাকা এবং বিদেশে প্রায় ১৩,২৭৮ কোটি টাকার সম্পত্তি ইতোমধ্যে ফ্রিজ বা জব্দ করা সম্ভব হয়েছে।

​অর্থ পাচারের পাশাপাশি জ্বালানি খাত ও দেশের মেগা প্রকল্পগুলোকে বানানো হয়েছিল অবাধ কমিশন ও লুটপাটের নিরাপদ অভয়ারণ্য। শ্বেতপত্র কমিটির তদন্তে দেখা যায়, কেবল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেই অপচয় ও দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষতি করা হয়েছে কমপক্ষে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা। এই লুটের অর্ধেকেরও বেশি বা ৩৬ হাজার কোটি টাকা গেছে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কমিশন হিসেবে এবং বাকি ৩৬ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে অপ্রয়োজনীয় ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ ও অন্যায্য মুনাফা পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। অন্যদিকে মেগা প্রজেক্টগুলোর প্রাক্কলিত ব্যয় কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে এবং অপ্রয়োজনীয় চুক্তি করে ১.৬১ ট্রিলিয়ন থেকে ২.৮০ ট্রিলিয়ন টাকা (১ লাখ ৬১ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা) আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ বাবদ দেওয়া হয়েছে ৭৭ হাজার থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা এবং রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে গেছে অতিরিক্ত ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি।

​মেগা প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেশের সম্পদের অপচয়ের ভয়াবহ রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল অনুমোদন ছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকায়, যা অনিয়ম ও ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে শেষ পর্যন্ত ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকায় ঠেকানো হয়। একইভাবে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সমীক্ষা ছাড়াই নির্মিত প্রায় ১০,৬৮৯ কোটি টাকার ‘কর্ণফুলী টানেল’ বর্তমানে সরকারের জন্য এক বিশাল ‘সাদা হাতি’ ও চরম লোকসানি প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। আইএমইডি-এর (IMED) প্রতিবেদনে টানেলটিতে ১,৬১৬ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ ছাড়াও দেখা যায়— সার্ভিস এরিয়ার নামে অপ্রয়োজনীয় রিসোর্ট নির্মাণ এবং প্রতিদিন প্রায় ২২ লাখ টাকা পরিচালন ব্যয়ের বিপরীতে মাত্র ১২ লাখ টাকা টোল আদায় হওয়ায় এটি দৈনিক ১০ লাখ টাকার লোকসান গুনছে।

অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে প্রায় ৫৯,০০০ কোটি টাকা (বা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার) দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগের ওপর তদন্ত চালাচ্ছে দুদক, যে প্রকল্পের আবাসন খাতের একটি বালিশ কিনতেই খরচ দেখানো হয়েছিল ৮৯,০০০ থেকে ৯০,০০০ টাকা!

বিগত সরকারের নজিরবিহীন এই প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট, অর্থ পাচার ও অপচয়মূলক নীতির চূড়ান্ত পরিণতি এখন ভোগ করছে দেশের সাধারণ মানুষ। ঋণের বিশাল বোঝা ঘাড়ে নিয়ে এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করাই এখন দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় অগ্রাধিকার বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

লেখক: দাঊদ আরমান (রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

Leave a Comment

সম্পাদক: দাঊদ আরমান

অফিস: চট্টেশ্বরী রোড, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

ইমেইল: khobor24ghontabangla@gmail.com

Latest Articles

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
©
খবর ২৪ ঘণ্টা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত (২০২৪ – ২০২৬)
Registration No.: 391/2025-26

Developed BY  Netfie.com