Home » ভারতকে বাদ দিয়ে বিকল্প গন্তব্যে বাংলাদেশি রোগীদের যাত্রা

ভারতকে বাদ দিয়ে বিকল্প গন্তব্যে বাংলাদেশি রোগীদের যাত্রা

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট ও সম্ভাবনা

by খবর ২৪ ঘন্টা
0 comments 397 views
A+A-
Reset
দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং মেডিকেল ট্যুরিজমে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতা এবং পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের ভিসা জটিলতা আর মানুষের তেমন উদ্বেগের কারণ নয়। বরং চিকিৎসার ক্ষেত্রে অন্যান্য উন্নত গন্তব্য যেমন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। এখন রোগীরা গন্তব্য নয়, বরং উন্নতমানের হাসপাতাল, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং সহজতর আনুষঙ্গিক সেবা বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের রোগীদের মধ্যে হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং নিউরো সমস্যার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার হার উল্লেখযোগ্য।

বিদেশে চিকিৎসার জন্য বার্ষিক ব্যয় এবং প্রবণতা

বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের প্রাথমিক গবেষণায় সম্প্রতি দেখা গিয়েছে, প্রতিবছর ৯ থেকে ১০ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, যেখানে বছরে কমপক্ষে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা) খরচ হচ্ছে। বিদেশমুখী রোগীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ ভারতের দিকে ঝোঁকেন। এ ছাড়া থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে ২০ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৩ শতাংশ, এবং জাপান ও মালয়েশিয়ায় ২ শতাংশ করে রোগী যান। তবে সাম্প্রতিককালে ভারতের ভিসা সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের বিকল্প গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে যাওয়ার হার বেড়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে সম্প্রতি আমরা কথা বলেছিলাম বাংলাদেশ মেডিকেল ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন (বিএমটিএ) এর প্রেস সেক্রেটারি দাঊদ আরমানের সাথে, যিনি বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মেডিকেল ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠান প্রাইম মিডিয়াকেয়ার এর কর্ণধার।

দেশীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট

প্রাইম মিডিয়াকেয়ারের পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুধুমাত্র রোগ নির্ণয় বা রুটিন চেকআপের জন্য বিদেশে যান। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের ডায়াগনস্টিক সেবার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। দেশের আধুনিক ডায়াগনস্টিক সরঞ্জামের সংকট, দক্ষ জনবল ও প্রশিক্ষণের অভাব, এবং মানসম্মত সেবার ঘাটতি এর মূল কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

প্রাইম মিডিয়াকেয়ারের কর্ণধার দাঊদ আরমান বলেন,

“আমাদের অনেক রোগী উন্নত ডায়াগনস্টিকের জন্য বিদেশে যাচ্ছেন, কারণ দেশে সঠিক এবং নির্ভুল পরীক্ষার ক্ষেত্রে তারা আত্মবিশ্বাসী নন। এই আস্থার অভাবই মূলত মানুষকে বিদেশমুখী করছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ডায়াগনস্টিক সেবা ছাড়া রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অথচ আমাদের দেশে এই খাতটি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। উন্নত যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি এবং রোগীদের জন্য সেবার মান উন্নত করা জরুরি।”

এ ছাড়া, দেশের অনেক চিকিৎসক রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেন না, যা রোগী এবং চিকিৎসকের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব সৃষ্টি করে। সুনির্দিষ্ট রেফারেল ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। রোগীরা মনে করেন, বিদেশে গেলে তাদের জন্য সঠিক এবং সুষ্ঠু চিকিৎসার নিশ্চয়তা থাকবে।

এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য দেশের ডায়াগনস্টিক এবং চিকিৎসা খাতে মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক যন্ত্রপাতির সংযোজন, এবং চিকিৎসক-রোগীর মধ্যে আস্থার সম্পর্ক পুনঃস্থাপন অত্যন্ত জরুরি।

ভারতের ভিসা জটিলতা ও রোগীদের বিকল্প গন্তব্য

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সার্ভিস আপাতত বন্ধ রেখেছে। ফলে ভারতের হাসপাতালগুলো অর্থনৈতিক চাপে পড়লেও সমস্যার সমাধান ত্বরান্বিত হচ্ছে না।
তবে, চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা থেমে নেই। প্রাইম মিডিয়াকেয়ারের তথ্য অনুসারে, ভারতে যেতে না পারা রোগীদের ৬০ শতাংশ বর্তমানে মালয়েশিয়া, চায়না, তুরস্ক, সিংগাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশের দিকে ঝুঁকছেন। সম্প্রতি থাইল্যান্ড ই-ভিসা চালু করায় এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর দ্রুত ভিসা প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করায় রোগীদের জন্য এই গন্তব্যগুলো আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

সংকটের মধ্যে সম্ভাবনা

বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বহুদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ভিসা পেতে জটিলতা এবং দালালচক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের কারণে অনেকে বিকল্প গন্তব্য খুঁজছেন। ভারতের চিকিৎসা খাতের প্রতি রোগীদের নির্ভরতা একসময় উল্লেখযোগ্য থাকলেও বর্তমানে তাদের দৃষ্টি থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, এবং চীনের মতো দেশের দিকে ঘুরে যাচ্ছে।

এই দেশগুলো বাংলাদেশি রোগীদের আকৃষ্ট করতে বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছে। উন্নতমানের হাসপাতাল, দক্ষ চিকিৎসক, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা খরচের কারণে এগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এর সঙ্গে সহজতর ভিসা প্রক্রিয়াও একটি বড় কারণ। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ড বাংলাদেশিদের জন্য ই-ভিসা সুবিধা চালু করেছে, যা খুব সহজে পাওয়া যায়। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের ভিসাও ৫ থেকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুমোদন পেয়ে যায়। এই সুবিধাগুলো রোগীদের চিকিৎসার জন্য ভারত থেকে সরে গিয়ে বিকল্প গন্তব্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করছে।

এই প্রসঙ্গে দাঊদ আরমান বলেন,

“আমাদের অনেক রোগী এখন আর ভারতের দিকে তাকাচ্ছেন না। বরং তারা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছেন, যেখানে হাসপাতালের সেবার মান ভারত থেকেও উন্নত এবং ভিসা প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ।”

তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো গেলে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে। উন্নত ডায়াগনস্টিক সেবা, দক্ষ জনবল, এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে রোগীরা দেশে থেকেই মানসম্মত চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হবেন।

দেশের চিকিৎসা খাতের মূল সমস্যা হলো ডায়াগনস্টিক সেবার প্রতি মানুষের আস্থার অভাব এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি। আধুনিক সরঞ্জামের অভাব, দক্ষ জনবলের সংকট, এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীদের সম্পর্কের দূরত্ব এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে করণীয়

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

  • ডায়াগনস্টিক সেবার উন্নয়ন: আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজন এবং দক্ষ জনবল বৃদ্ধি।
  • রোগী ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা: রোগীদের যথাযথ সময় দেওয়া এবং সুনির্দিষ্ট রেফারেল ব্যবস্থা চালু।
  • সাশ্রয়ী চিকিৎসা: বিদেশমুখী রোগীদের দেশে সেবা দেওয়ার জন্য মানসম্পন্ন এবং সাশ্রয়ী সেবার প্রচলন।
  • মেডিকেল ট্যুরিজম উন্নয়ন: দেশে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বিদেশি রোগীদেরও আকৃষ্ট করতে পারে।

দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং মেডিকেল ট্যুরিজমে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী রোগীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে বাংলাদেশ মেডিকেল ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন (বিএমটিএ) আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিএমটিএ’র লক্ষ্য হলো রোগীদের উন্নতমানের চিকিৎসা সেবার সঠিক দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করা এবং দেশ-বিদেশের উন্নত হাসপাতাল এবং ডাক্তারদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে সঠিকভাবে প্রমোট করা ।

দালালচক্রের মাধ্যমে অনেক রোগীই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেন এবং সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু অভিজ্ঞ মেডিকেল ভ্যালু ট্রাভেল কনসালট্যান্টদের মতামত গ্রহণ করলে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা সেবা পেতে পারেন এবং একইসঙ্গে চিকিৎসার খরচও সাশ্রয় করতে পারেন।

বিষয়টি নিয়ে দাঊদ আরমান বলেন,

“রোগীরা যদি দালালদের কাছে না গিয়ে অভিজ্ঞ কনসালট্যান্টদের মতামত গ্রহণ করেন, তাহলে তাদের চিকিৎসা সেবা আরও কার্যকর এবং লাভজনক হবে। সঠিক পরিকল্পনা এবং দক্ষতার মাধ্যমে চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়াটি সহজতর করা সম্ভব।”

You may also like

Leave a Comment

সম্পাদক: দাঊদ আরমান

অফিস: গুলজার টাওয়ার (২য় তলা), চট্টেশ্বরী রোড, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

ইমেইল: khobor24ghontabangla@gmail.com

Latest Articles

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
©
খবর ২৪ ঘণ্টা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত (২০২৪ – ২০২৬)
Registration No.: 391/2025-26

Developed BY  Netfie.com