চট্টগ্রামের উপকূলীয় দ্বীপ সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হলো। আজ (২৪ মার্চ) সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট থেকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ফেরিঘাট নৌপথে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলো ফেরি সার্ভিস। এর মাধ্যমে যাত্রী ও মালামালবাহী যানবাহনের চলাচল সহজতর হলো। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাতজন উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার দুজন বিশেষ সহকারী উপস্থিত ছিলেন।
নতুন যুগের সূচনা
সন্দ্বীপ, যার আয়তন মাত্র ৭৫০ বর্গকিলোমিটার, দীর্ঘদিন ধরেই যাতায়াত সমস্যায় ভুগছিল। কুমিরা-গুপ্তছড়াসহ ছয়টি নৌপথ থাকলেও যাত্রীদের মূলত ঝুঁকিপূর্ণ স্পিডবোট ও কাঠের ট্রলারের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন ফেরি চালুর ফলে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উদ্বোধনী আয়োজন
সকাল সোয়া আটটার দিকে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে উপদেষ্টাদের গাড়িবহর পৌঁছে। প্রথমে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বিআরটিসি বাস উদ্বোধন করেন। এরপর নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ফেরিঘাট উদ্বোধন করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সকাল ৯টায় প্রথম ফেরিটি সন্দ্বীপের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং ১০টায় গুপ্তছড়া ঘাটে পৌঁছায়।

আজ সকালে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট এলাকায় সন্দ্বীপের ফেরি চলাচল উদ্বোধন করছেন উপদেষ্টারা। (ছবি: প্রথম আলো)
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা বীর প্রতীক ফারুক-ই-আজম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধন রঞ্জন রায় পোদ্দার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান।
দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলাফল
২০১৩ সালে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় ৭০০ মিটারের একটি জেটি নির্মাণের মাধ্যমে ফেরি সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা শুরু হয়। তবে মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতায় এটি বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়। ২০২০ সালে সন্দ্বীপের জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান সরকারের কাছে ফেরি চালুর প্রস্তাব দেন।
তারই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ ফেরি সার্ভিস চালুর জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাক্কলন নির্ধারণ করতে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে বর্তমান পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ওই কমিটি সম্ভাব্য তিনটি নৌপথ পরিদর্শন করে ফেরি চলাচলের জন্য গাছুয়া আমির মোহাম্মদঘাট (সন্দ্বীপ)-বাঁকখালী (সীতাকুণ্ড) রুট চূড়ান্ত করে। সে সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০২৩ সালের মার্চে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে বেড়িবাঁধ থেকে সন্দ্বীপ চ্যানেলের দিকে ২ কিলোমিটার সড়কও নির্মাণ করে। নির্মাণের এক মাসের মাথায় সড়কটির সাগরের দিকের অংশ প্রবল জোয়ের ঢেউয়ে ধসে গেলে সেখানে ঘাট নির্মাণে সংশয় তৈরি হয়। এরপর আরও একাধিকবার কমিটির সদস্যরা উপযুক্ত নৌপথ নির্ধারণে পরিদর্শন করেন। গত বছরের ৫ আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সন্দ্বীপের বাসিন্দা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান আবারও উদ্যোগী হয়ে ফেরিঘাট নির্মাণ কার্যক্রম হাতে নেন। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় পুনরায় সে বছরের ২৯ আগস্ট একাধিক ঘাট এলাকা পরিদর্শন করে বিআইডব্লিউটিএর গঠিত কমিটি। পরে কমিটি বাঁশবাড়িয়া-গুপ্তছড়া নৌরুটে ফেরি সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেয়।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
দেশের উপকূলীয় নদীবন্দর এলাকায় এটাই প্রথম ফেরি সার্ভিস। বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান জানান, সন্দ্বীপ চ্যানেলে পানির স্তরের পরিবর্তন এবং পলি জমার কারণে ফেরি চলাচলে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে উপযোগী ফেরি নির্মাণ করা হলে এসব সমস্যা সমাধান সম্ভব হবে।
ফেরি ভাড়া ও সময়সূচি
বিআইডব্লিউটিসি ফেরি ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করেছে। পণ্যবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে ভাড়া ১,৩০০-৫,৭০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে ৭৫০ টাকা এবং মোটরসাইকেলের জন্য ১৫০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ ৩১ মার্চ পর্যন্ত ফেরির সময়সূচি প্রকাশ করেছে। প্রথম তিন দিন দিনে দুবার, এরপর দিনে একবার করে চলবে ফেরি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এটি দীর্ঘমেয়াদে চালু রাখা হবে।