বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশে যে কয়টি খাত যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে, তার মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প (RMG sector) শীর্ষে। অথচ এই শিল্প যে আজকের বাংলাদেশে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস—তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রায় পাঁচ দশক আগে। তিনি শুধু যুদ্ধজয়ী বীর বা রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না, ছিলেন একজন বাস্তববাদী উন্নয়ন দার্শনিক, যিনি অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করতে জানতেন।
১৯৭৮ সালের ৪ জুলাই, জিয়ার শাসনামলে দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প গ্রুপ দেইউ-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে দেশ গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠার চুক্তি হয়। এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম তৈরি পোশাক রপ্তানিমুখী উদ্যোগ। তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ১৩০ জন তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় দক্ষিণ কোরিয়ার পুসানে—যেখানে হাতে-কলমে শেখানো হয় গার্মেন্টস পণ্য উৎপাদনের শিল্প। এখান থেকেই সূচনা ঘটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সোনালি যাত্রা।

এ শিল্পকে গতিশীল করতে শহীদ জিয়া একই সময়ে চালু করেন স্পেশাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ স্কিম—যার মাধ্যমে রপ্তানিকারকরা শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পান। এটা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং উদ্যোক্তাবান্ধব একটি নীতিগত বিপ্লব, যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত দ্রুত রপ্তানিকেন্দ্রিক শিল্পে পরিণত হয়। আজ যা আমাদের জিডিপি ও বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।
২০২৪ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ মোট ৩৮.৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ৫০.৩৪% রপ্তানি হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) বাজারে, যার পরিমাণ ১৯.৩৭ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে রপ্তানি হয়েছে ৭.২ বিলিয়ন ডলার (১৮.৭২%)। যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হয়েছে ৪.৩ বিলিয়ন ডলার (১১.২৫%)।

বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের রপ্তানির বিবরণে দেখা যায়, জার্মানিতে ৪.৮৩ বিলিয়ন, স্পেনে ৩.৪২ বিলিয়ন এবং ফ্রান্সে ২.১৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি হয়েছে। কানাডায় রপ্তানি হয়েছে ১.২৪ বিলিয়ন ডলার।
তবে শুধু প্রচলিত বাজার নয়, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ নতুন বাজারেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এসব বাজারে ২০২৪ সালে মোট রপ্তানি হয়েছে ৬.৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ১৬.৪৬ শতাংশ। এর মধ্যে জাপানে ১.১২ বিলিয়ন, অস্ট্রেলিয়ায় ৮৩১ মিলিয়ন, ভারতে ৬০৬ মিলিয়ন, তুরস্কে ৪২৬ মিলিয়ন এবং রাশিয়ায় ৩৪৩ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হয়েছে।
শহীদ জিয়ার সেই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ না থাকলে বাংলাদেশ আজ এই অবস্থানে আসতে পারত না। তাঁর হাতে গড়া বীজ থেকে জন্ম নিয়েছে এমন একটি শিল্প, যা আজ কোটি মানুষের জীবনের অবলম্বন, এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে কার্যকর চালিকাশক্তি। তিনি শুধু স্বপ্ন দেখেননি, বাস্তবে তা রূপ দিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন নির্ভয়ে।
এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে—শুধু ইতিহাস রক্ষার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও।