শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুধু একটি অধ্যায় নয়—এটি একটি যুগান্তকারী চিন্তাধারা। এই ধারণা জন্ম নিয়েছিল স্বাধীনতার পরবর্তী এক সংকটময় সময়ে, যখন একটি নতুন রাষ্ট্র তার পরিচয়, লক্ষ্য ও পথ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ তাই কেবল ক্ষমতার রাজনীতির ভাষা নয়; এটি ছিল জাতির আত্মপরিচয় নির্ধারণের এক গভীর দার্শনিক প্রচেষ্টা।
এই জাতীয়তাবাদ আমাদের বলে দেয়, বাংলাদেশ শুধু একটি ভূখণ্ড নয়—এটি একটি বহুমাত্রিক সমাজ, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও ইতিহাস একসাথে মিলিত হয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা গড়ে তুলেছে। শহীদ জিয়াউর রহমান এই ধারণার মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা হবে রাষ্ট্রচিন্তার মূল স্তম্ভ। তাঁর প্রবর্তিত এই দর্শন আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্ক, পরিচয়চেতনা ও ভবিষ্যৎ ভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।
এই লেখার পরবর্তী অংশগুলোতে আমরা অনুসন্ধান করব—কীভাবে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ জন্ম নিয়েছিল, কেন এটি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল, এবং বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য কতটা প্রাসঙ্গিক।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জন্য ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা উপস্থাপন করেন একটি বৃহত্তর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার লক্ষ্যে। সে সময় ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ছিল মূলত ভাষাভিত্তিক। কিন্তু তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে শুধু বাঙালিরাই নয়—পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষেরাও বসবাস করে। তাই তিনি এমন একটি জাতীয় পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, যা ভাষা, ধর্ম ও নৃ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে এই ভূখণ্ডের সব মানুষকে একত্রিত করবে।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বাংলা ভাষার গুরুত্ব যেমন স্বীকৃত, তেমনি দেশের ভূখণ্ড, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও হাজার বছরের ঐতিহ্যকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়কে কেবল ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রিক পরিচয় বা Sovereign Identity গড়ে তোলা হয়েছে। এই দর্শন বাংলাদেশের জনগণকে একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচিত করেছে।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগ এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বিভেদ দূর করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে এই দর্শন একটি কমন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ মোকাবিলা এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় আমাদের একসূত্রে বাঁধে। এটি মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রের প্রশ্নে আমরা সবাই এক ও অভিন্ন।
জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন আমরা তার প্রণীত ১৯ দফা কর্মসূচির মধ্যেও দেখতে পাই। গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও আত্মনির্ভরশীলতার যে ভিত্তি তিনি স্থাপন করেছিলেন, তার সুফল আজও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে প্রতিফলিত। রপ্তানি খাতের বিকাশ, উৎপাদনে গতি এবং পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোকে জাতীয় মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে দেশের অখণ্ডতা ও সংহতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
আজ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ যখন তার স্বকীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের কথা দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে, তখন সেই আত্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এই শক্তিশালী দর্শন। এটি আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে এক সুতোয় গেঁথে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।