দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মানুষ অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে। বহু প্রতীক্ষিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়েছে এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। জনগণের রায়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), আর প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে ২১১ আসনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পর্যবেক্ষক দলসহ আন্তর্জাতিক মহলে এ নির্বাচন স্বীকৃতি পায়। ইইউ পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে অভিহিত করেন এবং জানান, ভোট কারচুপি বা জালিয়াতির কোনো প্রমাণ তারা পাননি।
এর আগে ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের নির্বাচন’ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় দেশের মানুষের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা কমে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসে পরিবর্তন। ২০২৬ সালের এ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা ছিল দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্ম নেওয়া তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি বগুড়া জেলা বিএনপির সদস্য হন।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন স্ট্র্যাটেজি কমিটি’র সদস্য হিসেবে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচটি আসনের প্রচারণা সমন্বয় করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের পক্ষে দেশব্যাপী জনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পরবর্তীতে ২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন।
রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। ১/১১ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে কারাবরণ করতে হয় এবং পরে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করলেও তিনি অনলাইনের মাধ্যমে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও আন্দোলনে দিকনির্দেশনা দেন।
২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী হলে তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়। এরপর থেকে তিনি দলের নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার দেশে ফেরার পথ সুগম হয়। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসেন। ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান হন।
নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমান অপশাসন, নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের অবসান এবং জনগণের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন। বিশ্লেষকদের মতে, তার এই প্রতিশ্রুতিই নির্বাচনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার রাতটি তাই শুধু সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং গণতান্ত্রিক চর্চায় নতুন অধ্যায়ের সূচনার রাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবারও গণতান্ত্রিক পথচলায় দৃঢ় পদক্ষেপ রাখল—এমনটাই প্রত্যাশা দেশের মানুষের।