মানুষের জীবনে সংকট আসতেই পারে, কিন্তু সেই সংকটের দোহাই দিয়ে অন্যের আমানত খিয়ানত করা, শ্রমিকের ঘাম ঝরানো মজুরি আটকে রাখা কিংবা ঋণের টাকা ফেরত না দিয়ে নিশ্চুপ থাকা কোনো সাধারণ ভুল নয়—এটি স্পষ্ট জুলুম। যখন একজন মানুষ তার ন্যায্য পাওনার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর চোখের পানি ঝরায়, তখন সেই অশ্রু সরাসরি আরশে আজিমে গিয়ে আঘাত করে। পবিত্র রমজান মাসে, যখন মুমিনরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে, তখন যদি কারও আমানত খেয়ানত করে বা কাউকে ধোঁকা দিয়ে কেউ রোজা রাখে, তবে সেই উপবাস আল্লাহর কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
সামর্থ্য থাকতে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা ‘জুলুম’
অনেকের সামর্থ্য থাকে, কিন্তু আলস্য বা অবহেলার কারণে পাওনাদারের টাকা ফেরত দেন না। এটি কত বড় অপরাধ তা বুখারী শরীফের এই হাদিসটি পড়লে বোঝা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“ধনী ব্যক্তির পক্ষ থেকে (ঋণ পরিশোধে) টালবাহানা করা একটি জুলুম।” (সহীহ বুখারী: ২২৮৭)
ইসলামের দৃষ্টিতে এই টালবাহানা করা ব্যক্তি একজন ‘জালেম’ বা অত্যাচারী হিসেবে গণ্য হবেন। আর কিয়ামতের দিন জালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।
শ্রমিকের মজুরি নিয়ে ছিনিমিনি খেলার পরিণাম
কাউকে দিয়ে কাজ করিয়ে তার পারিশ্রমিক না দেওয়া বা কম দেওয়া আল্লাহর সাথে সরাসরি যুদ্ধ করার সমান। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
“কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগকারী হবো… তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করলো এবং তার কাছ থেকে কাজ বুঝে নিলো, কিন্তু তার মজুরি দিল না।” (সহীহ বুখারী: ২২২৭)
ভাবুন তো, যার বিরুদ্ধে স্বয়ং আল্লাহ অভিযোগকারী হিসেবে দাঁড়াবেন, তাকে রক্ষা করার সাধ্য কার আছে?
ঋণের বোঝা নিয়ে জান্নাত অসম্ভব
একজন শহীদ আল্লাহর রাস্তায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেন, কিন্তু তারও সব গুনাহ মাফ হলেও ‘ঋণ’ মাফ হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, ঋণ ছাড়া।” (সহীহ মুসলিম: ১৮৮৬)
এমনকি ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কেউ মারা গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তার জানাজা পড়াতেও অস্বীকৃতি জানাতেন যতক্ষণ না কেউ সেই ঋণের দায়ভার নিত।
মজলুমের চোখের পানি ও আরশের কাঁপন
আপনি যখন কাউকে ধোঁকা দিয়ে তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছেন, তখন সে যদি হাত তুলে আল্লাহর কাছে বিচার চায়, তবে সেই দোয়া আর আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না। নবী করিম (সা.) হযরত মুয়াজ (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন:
“মজলুমের (অত্যাচারিতের) বদদোয়াকে ভয় করো, কারণ তার এবং আল্লাহর মাঝে কোনো আড়াল থাকে না।” (সহীহ বুখারী: ২৪৪৮)
রমজান মাসে যেখানে দোয়া কবুলের সময়, সেখানে একজন মজলুমের দীর্ঘশ্বাস আপনার সমস্ত ইবাদতকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
যারা মনে করছেন টাকা আত্মসাৎ করে বা মানুষকে ঠকিয়ে সুখে থাকবেন, তারা আসলে নিজের ঘরে জাহান্নামের আগুন টেনে আনছেন। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করতে হলে আগে মানুষের হক আদায় করুন। আল্লাহ হয়তো নিজের হক (নামাজ-রোজা) মাফ করে দিতে পারেন, কিন্তু বান্দার হক ততক্ষণ মাফ হবে না যতক্ষণ না সেই পাওনাদার ব্যক্তি আপনাকে মন থেকে ক্ষমা করছেন।
মনে রাখবেন, অন্যের চোখের পানি আপনার পরকালের ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
লেখা সূত্র:
শায়খ মুহাম্মদ আলি আল-সাবুনি,
তাফসির ও হাদিস গবেষক, উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় – মক্কা