ককেশাস পর্বতমালার কোলে ঘুমিয়ে থাকা এক প্রাচীন জনপদ— আর্মেনিয়া। ইতিহাসে এই দেশটির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকলেও আধুনিক পর্যটকদের কাছে এটি আজও এক রহস্যময় গন্তব্য। এখানে মেঘেদের সাথে পাহাড়ের লুকোচুরি চলে, আর প্রাচীন মঠগুলোর দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় সহস্র বছরের প্রার্থনা। লিজেন্ড অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর নূহের নৌকা যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছিল, সেই পুণ্যভূমির খোঁজ পেতে আপনাকে যেতে হবে এই মায়াবী দেশে।
চলুন চিনে নেওয়া যাক ককেশাসের এই প্রাচীন দেশটিকে ৫টি অনন্য তথ্যের মাধ্যমে:
১. স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বাধ্যতামূলক ‘দাবা’
আর্মেনিয়ায় দাবা খেলাকে কেবল একটি বিনোদন বা খেলা হিসেবে দেখা হয় না; এটি তাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ। ২০১১ সাল থেকে দেশটির প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দাবা খেলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর্মেনিয়ানরা বিশ্বাস করে, দাবা শিশুদের কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং একাগ্রতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই কারণেই এত ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বে দাবার গ্র্যান্ডমাস্টার তৈরির হারে তারা অনেক এগিয়ে।
২. বিশ্বের প্রথম খ্রিস্টান রাষ্ট্র
ইতিহাসের পাতায় আর্মেনিয়ার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, এটি বিশ্বের প্রথম দেশ যারা খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ৩০১ খ্রিস্টাব্দে রাজা তৃতীয় তিরিডেটস আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন। দেশটির ‘এচমিয়াদজিন ক্যাথেড্রাল’ (Etchmiadzin Cathedral) কে বিশ্বের প্রাচীনতম সরকারি গির্জা হিসেবে গণ্য করা হয়, যা আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

৩. মায়াবী ‘গোলাপি শহর’ ইয়েরেভান
আর্মেনিয়ার রাজধানী শহর ইয়েরেভান-কে ভালোবেসে সবাই ‘গোলাপি শহর’ বলে ডাকে। এর কারণ কোনো কৃত্রিম রং নয়, বরং প্রাকৃতিক পাথর। শহরের অধিকাংশ দালান নির্মাণ করা হয়েছে স্থানীয় আগ্নেয়শিলা ‘টাফ’ (Tuff) দিয়ে, যার রং প্রাকৃতিকভাবেই গোলাপি আভার। গোধূলির আলো যখন এই দালানগুলোর ওপর পড়ে, তখন পুরো শহর এক অপার্থিব মায়াবী রূপ ধারণ করে।
৪. নূহের নৌকা ও মাউন্ট আরারাত
বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর নূহের নৌকা যেখানে ভিড়েছিল, সেই মাউন্ট আরারাত আর্মেনিয়ানদের জাতীয় প্রতীক। যদিও বর্তমানে এই পাহাড়টি তুরস্কের সীমানার মধ্যে পড়েছে, তবুও ইয়েরেভান শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে এর বরফঢাকা চূড়া স্পষ্ট দেখা যায়। আর্মেনিয়ানদের হৃদয়ে এই পাহাড়টি কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং তাদের অস্তিত্ব ও আধ্যাত্মিকতার মূলে রয়েছে আরারাত।
৫. বিশ্বের প্রাচীনতম ওয়াইনারি ও জুতো
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন জুতো (প্রায় ৫,৫০০ বছর পুরনো) এবং প্রাচীনতম ওয়াইনারি (প্রায় ৬,১০০ বছর পুরনো) এই আর্মেনিয়ার ‘আরেনি-১’ (Areni-1) গুহায় পাওয়া গেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মানবসভ্যতার একদম শুরু থেকেই আর্মেনিয়ানরা শিল্প ও উৎপাদনে কতটা উন্নত ছিল। তাদের তৈরি বিশেষ আঙ্গুর বা এপ্রিকট থেকে তৈরি পানীয় আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
আর্মেনিয়ার এই প্রাচীন ইতিহাস আর দাবার চাল কি আপনাকে মুগ্ধ করেছে? পাহাড়ের গায়ের সেই পুরনো মঠগুলোর নির্জনতা একবার অনুভব করার ইচ্ছা কি আপনারও হয়?