শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বা সফল রাষ্ট্রনায়ক নন, তিনি ছিলেন ভবিষ্যৎ-প্রত্যয়ী এক দূরদর্শী পুরুষ, যিনি বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে নতুন আকাশ ও সমুদ্রে বিস্তৃত করেছিলেন। তাঁর দূরদৃষ্টি ছিল কেবল ভূখণ্ডকেন্দ্রিক নয়, বরং তিনি সমুদ্রসম্পদকেও জাতীয় অর্থনীতির একটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করেছিলেন। উন্নত বিশ্বে ব্লু ইকোনমি তথা সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতির গুরুত্ব যে রকমভাবে বিবেচিত হয়, সেই ধারার ভিত্তিপ্রস্তরই স্থাপন করেছিলেন শহীদ জিয়া।
১৯৮০ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম ‘সমুদ্রসম্পদ বিষয়ক জাতীয় সেমিনার’। এটাই ছিল সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ভাবনার শুরুর দিগন্ত। এর আগে সমুদ্রের গভীরতা, প্রাণিবৈচিত্র্য, খনিজ ও জ্বালানিসম্পদ বিষয়ে আমাদের কোনো কার্যকর গবেষণা বা রাষ্ট্রীয় আগ্রহ ছিল না। শহীদ জিয়ার নির্দেশেই ১৯৮০ সালের নভেম্বর থেকে সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয় এবং গঠিত হয় ‘ন্যাশনাল কমিটি অন এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেশন অব মেরিন রিসোর্সেস (এনসারসো)’। একইসাথে চট্টগ্রামে সমুদ্র বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ছিল তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তার বাস্তব রূপ।

১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হয় ব্যতিক্রমধর্মী একটি শিক্ষা সফর—দেশসেরা বিজ্ঞানী ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে বঙ্গোপসাগরে গবেষণামূলক ভ্রমণ, যেখানে রাষ্ট্রপতি জিয়া নিজেও অংশ নেন ‘হিজবুল বাহার’ জাহাজে। এটি ছিল এক ঐতিহাসিক উদাহরণ—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কিভাবে জ্ঞানের প্রসার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে জাতিকে নিয়ে যেতে পারে তার বাস্তব প্রমাণ।
সমুদ্রসম্পদ আহরণে তাঁর কার্যকর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনি প্রথম যান্ত্রিক মাছ ধরার ট্রলারের ব্যবস্থা করেন এবং গভীর সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ ও রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন পথ উন্মুক্ত করেন। আজ যা বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি নীতির ভিত্তি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। তাঁর এই উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচনা নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রদর্শনেরও জন্ম দেয়—যেখানে সীমানা মানে শুধু স্থলভূমি নয়, বরং সমুদ্রও আমাদের জাতীয় পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তার নেতৃত্বে বঙ্গোপসাগরের অগণিত সম্পদকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ করে তোলার যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে আরও এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালেও এসে আমরা দেখতে পাই, সেই স্বপ্ন এখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার—প্রায় ১২০ কিলোমিটার বা ৭৫ মাইল বিস্তৃত—যা শুধু পর্যটনের নয়, জাহাজ নির্মাণ, গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণ, লবণ ও খনিজ সম্পদ, সমুদ্র গবেষণা, জলজ জৈবপ্রযুক্তি, পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি (সমুদ্রবায়ু বা টাইডাল এনার্জি) সহ বহু সম্ভাবনার উৎস হতে পারতো। কিন্তু আজও এই সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতা স্পষ্ট।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে সমুদ্রসম্পদ ও ব্লু ইকোনমি নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বিস্তর অগ্রগতি হয়েছে। সুইডেনের World Maritime University সমুদ্র প্রশাসন, নৌযান প্রযুক্তি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা শিক্ষায় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাজ্যের University of Southampton সমুদ্রবিজ্ঞান (Oceanography) ও সামুদ্রিক প্রকৌশল (Marine Engineering)-এর জন্য অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খ্যাত। যুক্তরাষ্ট্রের University of California, San Diego-এর অধীনে থাকা Scripps Institution of Oceanography পৃথিবীর অন্যতম পুরাতন ও মর্যাদাপূর্ণ সামুদ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা জৈব ও খনিজ সম্পদ নিয়ে গবেষণায় বিশ্বনেতার ভূমিকা রাখছে। এশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান National University of Singapore (NUS) Maritime Studies ও Ports & Shipping Management-এ দক্ষিণ এশিয়ার হাব হিসেবে পরিচিত। অপরদিকে, Australian Maritime College (AMC) সমুদ্র পরিবহন, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং Ocean Engineering-এর ক্ষেত্রে দক্ষিণ গোলার্ধের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, আধুনিক বিশ্ব সমুদ্রসম্পদকে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং শিক্ষা, গবেষণা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটি কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করছে।
কিন্তু আমাদের দেশে এখনো ‘Marine Science’, ‘Oceanography’, বা ‘Blue Economy’-র মতো বিষয়ের উপর একটি পূর্ণাঙ্গ, বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কাঠামো গড়ে উঠেনি। যেখানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের এখানে এসে পড়ার কথা, সেখানে আমরাই নিজেদের উপকূল ও মহাসাগর বিষয়ে এখনো আত্মজ্ঞানে দারিদ্র্যগ্রস্ত। এটা শুধু একটি শিক্ষা বা উন্নয়ন ঘাটতির কথা নয়; বরং এটি শহীদ জিয়াউর রহমানের দেখানো একটি স্বপ্নের অপূর্ণতার কথা। তিনি আমাদের বলেছিলেন, সমুদ্র আমাদের সম্পদ—শুধু প্রাকৃতিক না, অর্থনৈতিক মুক্তিরও হাতিয়ার।
আজকের বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে “উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে উত্তরণের” লক্ষ্য নির্ধারণ করে থাকে, তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আমাদের সীমানা শুধু স্থলভাগ নয়, বরং সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে—মননে, গবেষণায় ও বাস্তব প্রয়োগে।