১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট।
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচির মসরুর বিমানঘাঁটিতে প্রতিদিনের মতোই রুটিন ফ্লাইট প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি চলছিল। তবে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের ২নং স্ক্রোয়াড্রন ইউনিটের পিএএফ-৪৩৬৭ ব্যাচধারী তরুণ বাঙালী ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের মনে তখন জ্বলছিল ভিন্ন এক আগুন—মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্বপ্ন। পূর্ব পাকিস্তান তথা তার জন্মভূমিতে তখন মুক্তিযুদ্ধের ৫ম মাস চলছে। তার পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান ছিনতাই করে ভারতে অবতরণ করা এবং তা মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা।
ঘড়িতে তখন সকাল ১১টা বেজে ৩০ মিনিট। মতিউর দেখলেন পাকিস্তান এয়ারফোর্সের শিক্ষানবিশ পাইলট ফ্লাইট অফিসার রশিদ মিনহাজ হ্যাঙ্গার থেকে দুই সিট বিশিষ্ট ‘লকহিড টি-৩৩ শ্যুটিং স্টার/টিবার্ড’ নামক একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে রানওয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মতিউর রানওয়ের দিকে এগিয়ে এসে হাত উঁচিয়ে মিনহাজকে বিমানে ওঠার সংকেত দেন। মতিউর রহমান বিমানের পেছনের সিটে উঠে বসেন এবং বলে উঠলেন, “I’ll guide you today.” মতিউর বিমানের প্রটেক্টেড গ্লাস শীল্ডের বাইরে রানওয়েতে অপেক্ষমান ক্রু-এর দিকে তাকিয়ে ফ্লাই-সিগন্যাল “স্যালুট” দিলে ক্রু রানওয়ে ছেড়ে দেয়। চোখের পলকে বিমানটি আকাশে উঠে গেলো। বিমানটি মসরুর বিমানঘাঁটির সীমানা পেরুতেই মতিউর বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনা কি ঘটতে যাচ্ছে তা আঁচ করতে পেরে সদ্য ট্রেনিং শেষ করা তরুণ পাইলট রশিদ মিনহাজ তাকে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করে। শুরু হয় ধস্তাধস্তি। এরই ফাঁকে রেডিও সুইচ অন করে করাচির এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে কাতর চিৎকারে বিমান ছিনতাইয়ের বার্তা জানিয়ে দেয় মিনহাজ।
মাঝ আকাশে বিমানের ঐ ছোট্ট ককপিটে দুই বিমান সেনার মধ্যে চলতে থাকে হ্যান্ড টু হ্যান্ড কম্ব্যাট। একদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমানের দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে রশিদ মিনহাজ চেষ্টা করছিলেন বিমানটিকে যেন ভারতের ভূখণ্ডে যেতে না দেওয়া হয়।
বিমানটি ততক্ষণে করাচি ছাড়িয়ে থাট্টা জেলা পেরিয়ে সুজাওয়াল জেলার আকাশে পৌঁছে গেছে। সেখান থেকে ভারতের গুজরাট আর মাত্র ৩৫ কিলোমিটার। কিন্তু মতিউরের ভাগ্য সহায় হলো না। স্টিয়ারিংয়ের নিয়ন্ত্রণ মিনহাজের হাতে থাকার সে ডাউন করে দিয়ে স্টিয়ারিং ছেড়ে দিলে একপর্যায়ে বিমানটি সোজা মাটিতে আছড়ে পড়ে। দুর্ঘটনায় দুজনেই মৃত্যুবরণ করে। মিনহাজের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এর একটু দূরে ছিটকে পড়ে ছিলো দুই তৃতীয়াংশ পুড়ে যাওয়া মতিউরের দেহ।
নির্যাতিত জাতির স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখা মতিউর রহমান সেদিন তার স্বপ্নের মাতৃভূমি স্বাধীন বাংলাদেশকে দেখে যেতে পারেননি ঠিক, তবে তার এই অনন্য আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাকে সর্বোচ্চ মরণোত্তর সামরিক সম্মাননা ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করে। অন্যদিকে নিজ দেশের সামরিক দায়িত্ব পালনে জীবন উৎসর্গ করায় পাকিস্তান সরকার রশিদ মিনহাজকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘নিশান-ই-হায়দার’ প্রদান করে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দু’দেশের দুই যুদ্ধবিমানের মধ্যে মাঝ-আকাশে ডগফাইট চলছে এমন ঘটনা অহরহ পেয়ে যাবেন। কিন্তু একই বিমানের ককপিটে লড়াই করা দু’জন বিপরীত মেরুর এবং বিপরীত আদর্শের যোদ্ধা নিজেদের জীবন দিয়ে নিজ নিজ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বীরত্বগাথার প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে- এমন ঘটনা বোধহয় ইতিহাসে আর একটিও নেই।