বাংলাদেশে রয়েছে ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। এগুলো আমাদের গৌরবময় অতীতের নিদর্শন এবং বিশ্ব দরবারে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। এখানে এমন পাঁচটি স্থান তুলে ধরা হলো, যা ইতিহাসপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শনার্থীদের কাছেও আকর্ষণীয়।
১. ঐতিহাসিক মসজিদের শহর, বাগেরহাট
মধ্যযুগীয় ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বাগেরহাট অন্যতম। এই স্থানটি প্রাচীন ইতিহাসে মুসলিম ধর্মীয় কার্যক্রম ও স্থাপত্যশিল্পের জন্য সুপরিচিত। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই শহরটি ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি খুলনা থেকে ১৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে ও ঢাকা থেকে ২০০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।

ষাট গম্বুজ মসজিদ
প্রাচীনকালে “খলিফাবাদ” নামে পরিচিত এই শহরটির গোড়াপত্তন হয় পঞ্চদশ শতকে মুসলিম ধর্মপ্রচারক ও তুর্কি সেনাপতি খান জাহান আলীর মাধ্যমে।
বাগেরহাটের মসজিদসমূহ
- ষাট গম্বুজ মসজিদ
- নয় গম্বুজ মসজিদ
- সিংগরা মসজিদ
- রণবিজয়পুর মসজিদ
- চুনাখোলা মসজিদ
- ছয় গম্বুজ মসজিদ
- খান জাহানের সমাধি
২. পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। এটি প্রায় ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় বৌদ্ধ বিহার হিসেবে পরিচিত এই স্থাপনাটি রাজশাহীর নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলায় অবস্থিত। পাল রাজা দ্বিতীয় ধর্মপাল অষ্টম শতকে এটি নির্মাণ করেন।

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার
১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এই স্থাপনাটি আবিষ্কার করেন। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
৩. সুন্দরবন
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। সুন্দরী গাছের নামানুসারে নামকরণ হওয়া এই বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী এবং বরগুনা জেলায় বিস্তৃত। এটি ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
সুন্দরবনে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, কুমির ও সাপসহ অনেক প্রজাতির জীবজন্তু। এছাড়া শীতকাল এই বনের সৌন্দর্য উপভোগের উপযুক্ত সময়।

সুন্দরবন
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য
- প্রায় ৩৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ
- ১২০ প্রজাতির মাছ
- ২৭০ প্রজাতির পাখি
- ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী
- ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ
৪. লালবাগ কেল্লা
পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত লালবাগ কেল্লা মুঘল আমলের একটি অন্যতম স্থাপনা। এটি ১৬৭৮ সালে মুঘল সুবেদার আজম শাহ নির্মাণ শুরু করেন।

লালবাগ কেল্লা
কেল্লার প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে সুবেদারের দরবার হল, মসজিদ এবং বেগম পারির সমাধি। পুরো কেল্লার স্থাপত্য মুঘলদের কারুকার্যের এক অনন্য উদাহরণ।
৫. মহাস্থানগড়
মহাস্থানগড় বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগরী এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের এক অপরূপ উদাহরণ। এটি বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। মহাস্থানগড়ের পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত এবং এটি খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার বছরের পুরোনো।

মহাস্থানগড়
মহাস্থানগড়ের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান:
- হযরত শাহ সুলতান বলখী (র.) এর মাজার
- প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর
- বেহুলার বাসর ঘর
- শীলাদেবীর ঘাট
- গোবিন্দ ভিটা
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এই স্থানগুলো কেবল পর্যটন আকর্ষণই নয়, আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যশিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন। এগুলো সংরক্ষণ এবং প্রচার করার মাধ্যমে দেশের মর্যাদা আরো সমুন্নত করা সম্ভব।
লেখক: সৌমিক বড়ুয়া