সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষত ফেসবুক, আজকের যুগে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই মাধ্যমটি যেমন সহজে তথ্য ছড়িয়ে দেয়, তেমনি এর মাধ্যমে ভুয়া তথ্যও ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশে এই সমস্যাটি দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। যাচাই না করে বিভ্রান্তিকর তথ্য শেয়ার করার ফলে অনেক সময় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, গুজব ও সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এরূপ একাধিক ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য বড় ধরনের দাঙ্গা বা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের আগস্টে ঢাকায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সদস্যদের আক্রমণ, ২০১৯ সালে ভোলার বোরহানউদ্দিনে ফেসবুকে একটি ভুয়া স্ক্রিনশট ভাইরাল হওয়া, ২০১৮ সালে ছেলেধরা গুজব সহ এরূপ অনেক ঘটনার ফলে বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটে। এই সংঘর্ষসমূহে প্রাণহানিও হয়। এসবের মূল কারণ ছিল ফেসবুক পোস্টটি যাচাই না করা।
কীভাবে ভুয়া তথ্য শনাক্ত করবেন?
ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার জন্য কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন:
সূত্র যাচাই করুন: যেকোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সূত্র যাচাই করুন। উদাহরণস্বরূপ, ফেসবুকে কোনো খবর দেখলে তা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা দেখে নিন।
প্রাসঙ্গিকতা এবং তারিখ দেখুন: অনেক সময় পুরোনো খবরকে নতুন ঘটনা বলে প্রচার করা হয়।
প্রথমে খোঁজ করুন, পরে শেয়ার করুন: ভুয়া তথ্য সহজেই বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়। এ জন্য গুগলে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হতে হবে যে তথ্যটি সঠিক।
ছবি এবং ভিডিও যাচাই করুন: অনেক সময় ভুয়া তথ্য ছড়ানোর জন্য পুরোনো ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করা হয়। এগুলো যাচাই করতে রিভার্স ইমেজ সার্চের মতো টুল ব্যবহার করা যেতে পারে।
তর্ক-বিতর্কে যুক্তির ভিত্তি খুঁজুন: ভুয়া তথ্য অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা মানুষকে আবেগপ্রবণ বা উত্তেজিত করে। শেয়ার করার আগে যুক্তি দিয়ে ভাবুন।
ভুয়া তথ্যের ভয়াবহ পরিণতি
সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই না করার প্রবণতা শুধু তর্কাতর্কি বা গুজব ছড়ায় না, বরং তা ভয়াবহ পরিণতিতে রূপ নিতে পারে। যেমন, সাম্প্রতিককালে বহিষ্কৃত এক ইস্কন ধর্মীয়গুরুকে গ্রেফতারের ইস্যুতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মিডিয়া যাচাই-বাছাই ছাড়া যেভাবে ঢালাওভাবে ভুল তথ্য প্রচার করে বেড়াচ্ছে, তার প্রধান একটা কারণ ফেসবুকে ভুল তথ্য ছড়ানো। এবং এই ঘটনার জেরে ইতিমধ্যে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কও নাজুক। বেশ অনেকগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে গিয়েছে ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ির কারণে।
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হলে পরিবার, স্কুল, এবং কমিউনিটির মধ্যেই শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা এবং তথ্য যাচাই করার দক্ষতা শেখানো সময়ের দাবি।
সতর্ক ব্যবহার এবং দায়িত্বশীল আচরণই আমাদের সোশ্যাল মিডিয়াকে গুজবমুক্ত রাখার প্রথম পদক্ষেপ। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝে তথ্য শেয়ার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক: দাঊদ আরমান, সম্পাদক, খবর ২৪ ঘন্টা